রবিবার, ২ সেপ্টেম্বর, ২০১২

শুদ্ধ উচ্চারণ বিষয়ক বক্তৃতা : শ, স ও ষ এর সূত্র - অধ্যাপক নরেন বিশ্বাস

পর্ব : ৭

এবার ব্যঞ্জন বর্ণের উচ্চারণ শুরু হলো :
আজ শ, স ও ষ এর সূত্র

নির্ধারিত সময়ের একটু পরেই এলেন স্যার। কেন যেন বেশ বিমর্ষ দেখাচ্ছিল তাঁকে। চেয়ারে বসে নিরাবেগে দৃষ্টি মেলে ধরলেন সামনের দিকে। তপন বেশ করিৎকর্মা ছেলে, সবকিছুর খবরাখবর ভালই রাখে। চট্ করে জিজ্ঞেস করলো, স্যার, আপনি নাকি অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। ম্লান মুখে ফুটে উঠলো হাসি, বললেন, শরীরের উপর বেশী ধকল গেলেতো তাড়াতাড়ি বিকল হবেই। এতো হলো একটি যন্ত্র। কেবল মন্ত্র দিয়েতো আর চালানো যায় না। আরাম যদি হারাম হয়, ব্যারামতো তখন ধরবেই। স্যারের জোড়ায় জোড়ায় কথা চলতে থাকতো আরো কিছুক্ষণ। কিন্তু রাজশাহীর মিলন ফস্ করে জানতে চাইলো, স্যার, এখন আপনার সরীর ভালো তো? হো হো হাসির ছররা বয়ে গেলো ক্লাসে। এদিক ওদিক তাকিয়ে ক্রোধান্বিত মিলন বসে পড়লো।
হাসি থামতেই স্যার শুরু করলেন, বাঙলায় তিনটি শ আছে। তালব্য, মুর্ধণ্য এবং দন্ত্য। তিনটি শ এর রূপ আলাদা হলেও বাঙলা ভাষায় একটিই শ (Sh) উচ্চারিত হয় প্রধানত মূলধ্বনি হিসেবে। তবে কোথাও কোথাও শ (Sh) কিন্তু স (S) এর মতো উচ্চারিত হয়।
সেটা কোথায় হয়? যখন শ সহধ্বনি হয়ে যায় অর্থাৎ অন্যধ্বনির প্রভাবে সেই শ টা স এর মতো হয়ে যায়। ত, থ, ন, র, ল এইসব দন্ত্য বা দন্ত্যমূলীয় বর্ণের সঙ্গে স বা শ যখন সংযুক্ত অবস্থায় উচ্চারিত হয়, তখন তার উচ্চারণ হয়ে যায় রীতিমতো স (S) এর মতো। যেমন :
মস্ত - মস্তো
সমস্ত - শোমোস্তো
দরখাস্ত - দরখাস্তো
বরখাস্ত - বরখাস্তো
প্রস্তুতি - প্রোস্তুতি
ব্যস্ত - ব্যাস্তো
গ্রস্ত - গ্রোস্তো
মস্তক - মস্তোক
বস্তি - বোস্তি
আস্তে - আস্তে
রাস্তা - রাস্তা
খাস্তা - খাস্তা
নাস্তা - নাস্তা
কাস্তে - কাস্তে
দস্তা - দসতা
কুস্তি - কুস্তি
দোস্তি - দোস্তি
বন্দোবস্ত - বন্দোবস্তো
ধস্তাধস্তি - ধস্তাধোস্তি
খিস্তি - খিস্তি
সুস্থ - শুস্থো
আস্থা - আস্থা
স্থিতি - স্থিতি
উপস্থিত - উপোস্থিত্
অস্থাবর - অস্থাবর
মুখস্ত - মুখোস্তো
ব্যবস্থা - ব্যবোস্থা
স্থান - স্থান
স্নান - স্নান (Snan)
স্নেহ - স্নেহো (Sneho)
স্নিগ্ধ - স্নিগ্ধ (Snigdho)
স্নায়োবিক - স্নায়োবিক (Snayobic)
অশ্লীল - অস্লীল
শ্লেষ - স্লেস (Slesh)
শ্লোক - স্লোক (Sloke)
শ্রোতা - স্রোতা (Srota)
শ্রবণ - স্রবন (Srobon)
শৃগাল - সৃগাল (Sreegal)
শৃঙ্গ - সৃংগো (Sreengo)
শ্রাবণ - স্রাবোন (Srabon)
শ্রীলঙ্কা - স্রীলংকা (Sreelonka)
শ্রীমান - স্রীমান (Sreeman)
প্রশ্ন - প্রোস্নো
শ্রদ্ধা - স্রোদ্ধা (Sroddha)
শ্রেয়সী - স্রেয়োশি (Sreyoshi)
বিশ্রী - বিস্স্রি
শ্রেষ্ঠ - স্রেশ্ঠো (Sreshtho)
সংশ্লিষ্ঠ - শঙস্লিশ্টো (Shongslishto)
শ্লাঘা - স্লাঘা (Slagha)
শ্লথগতি - স্লথোগোতি (Slothogoti)
এতগুলো উদাহরণ স্যার সহজে দেন না। আজ কেন জানি উন্মানা হয়ে নাকি অসুস্থ শরীরে জেদ চেপে যাওয়ায় একনাগাড়ে উদাহরণগুলি দিয়ে ধপ্ করে চেয়ারে বসে পড়লেন। লাল রঙা চায়ের গ্লাসের দিকে লোলুপ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে গা এগিয়ে দিলেন চেয়ারের পিছনে।
মিনা মিন্মিন্ করে বললো, স্যার ঞ্জ এবং জ্ঞ এর উচ্চারণ সস্পর্কে কিছু বলবেন কি? হতাশার ভাব বজায় রেখেই গাম্ভীর্যের সাথে ধীরে ধীরে উচ্চারণ করলেন, ঞ এর সাথে জ যুক্ত হয়ে ঞ্জ যুক্তধ্বনি তৈরী হয়। এতে ঞ এর উচ্চারণ ন এর মতো হয়, কিন্তু জ এর উচ্চারণ অবিকৃত থাকে। যেমন :
ভঞ্জ - ভন্জো
রঞ্জ - রন্জো
গঞ্জিত - গোন্জিতো
ব্যঞ্জন - ব্যান্জোন্
খঞ্জনা - খন্জোনা
অঞ্জনা - অন্জোনা
একটু টেনে দম নিয়ে শুরু করলেন ফের।
জ এর সাথে ঞ যুক্ত হয়ে জ্ঞ যুক্তধ্বনি তৈরী হয়। শব্দের আদিতে জ্ঞ এর উচ্চারণ সাধারণত গঁ বা গ্যঁ এর মতো এবং শব্দের মধ্যে ও অন্তে গ্গঁ এর মতো হয়। যেমন :
জ্ঞাত - গ্যাঁতো
জ্ঞান - গ্যাঁন
জ্ঞাপক - গ্যাঁপোক্
জ্ঞেয় - গেঁয়ো
বিজ্ঞান - বিগ্গ্যাঁন
বিজ্ঞপ্তি - বিগগোঁপ্তি
অজ্ঞান - অগ্গ্যাঁন
অবজ্ঞা - অবোগ্গাঁ
অজ্ঞ - অগ্গোঁ
বিজ্ঞ - বিগ্গোঁ
দৈবজ্ঞ - দোইবোগ্গোঁ
বিশেষজ্ঞ - বিশেশোগ্গোঁ
মিনা আবার বলে ফেললো, ঞ এর সাথে আর কোনো বর্ণ যুক্ত হয়ে যুক্তধ্বনি তৈরী করে কি?
স্যার ঠাণ্ডা গলায় বললেন, হ্যাঁ, চ, ছ, ঝ এই বর্ণগুলিও ঞ এর সাথে যুক্ত হয় এবং জ্ঞ এর মতোই ঞ এর উচ্চারণ ন এর মতো হয়। যেমন-
পঞ্চ - পন্চো
মঞ্চ - মন্চো
লাঞ্ছিত - লান্ছিতো
ঝঞ্ঝা - ঝন্ঝা
ঝঞ্ঝনা - ঝন্ঝোনা
কাঞ্চন - কান্চোন
মিনা আবার যেন কি বলতে যাচ্ছিল। কিন্তু স্যারের অসুস্থ ও ক্লান্ত শরীরের কথা ভেবে একসঙ্গে বেশ কয়েকবার পিছন থেকে শ্ শ্ শব্দ করে মিনাকে থামিয়ে দিল। চুপ্চাপ্ একটু বসে থেকে বিমর্ষ স্যার আস্তে আস্তে বাইরে চলে গেলেন।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন