শনিবার, ২৬ নভেম্বর, ২০১১

বাকশিল্পী নরেন বিশ্বাস স্মরণ ও নরেন বিশ্বাস পদক ২০১১ প্রদান অনুষ্ঠান ২৭শে নভেম্বর, সন্ধ্যা ৬।৩০ মিনিট, পাবলিক লাইব্রেরি, শাহবাগ


সুধী

বাকশিল্পী নরেন বিশ্বাস আমাদের অত্যন্ত শ্রদ্ধা ও ভালবাসার মানুষ ছিলেন, আজো আছেন স্মৃতিতে এবং তাঁর রেখে যাওয়া কর্মযজ্ঞের ভিতর। আগামী ২৭শে নভেম্বর, ২০১১ রবিবার তাঁর প্রয়াণ দিবসে প্রতিবারের মত কণ্ঠশীলন স্মারণিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে, শওকত ওসমান স্মৃতি মিলনায়তন, কেন্দ্রীয় পাবলিক লাইব্রেরি, শাহবাগ, ঢাকায় সন্ধ্যা সাড়ে ছ’টায়। অনুষ্ঠানের প্রধান বিষয় ‘নরেন বিশ্বাস পদক’ ২০১১ প্রদান। পদকের জন্য এবার মনোনীত হয়েছেন আবৃত্তি জগতে অর্ধশতাব্দীকালের পথ-পরিক্রমায় যাঁর উপস্থিতি যতিহীন, শিল্পী ও অন্যতম সংগঠক তারিক সালাহ উদ্দিন মাহমুদ। 

সকল সংস্কৃতিমনস্ক মানুষ, বিশেষ করে আবৃত্তিকর্মে যুক্ত ও উৎসাহী সকলের প্রতি আমাদের আন্তরিক আমন্ত্রণ আসুন- আমরা মিলিত হই বাকশিল্পীর স্মৃতি-তর্পণে যাঁর জীবন ও মৃত্যুর বিষয় ছিল বাংলা ভাষার শিল্পময় উচ্চারিত রূপ। বাঙালিকে বাঙালির আপন ভাষাকে সত্য করে সুন্দর করে পেতেই হবে। বাংলাকে পাবার সাধনায় নরেন বিশ্বাসের অবদান গুরুত্বপূর্ণ। সম্মিলিতভাবে তাঁকে স্মরণ করা, তাঁর কর্মকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার এইতো সময়।

শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী
সভাপতি

বাংলা ভাষা আজ বিপদের মধ্যে (সংযোজন কথন)- লেখকের মন্তব্য


মূল লেখার লিংক


সম্মানিত পাঠক,
অন লাইনে দেয়া আমার ”বাংলা ভাষা আজ বিপদের মধ্যে” লেখাটিকে নিয়ে আপনাদের ভিন্ন ভিন্ন মন্তব্য আমি অত্যন্ত বিনতভাবে গ্রহণ করেছি এবং তা নিয়ে আমার পরবর্তী সময়ের কিছু ভাবনা আজ এখানে যুক্ত করছি। তবে আমার এ প্রতিক্রিয়া প্রকাশের অনিবার্য দেরীতে আমি দুঃখ প্রকাশ করছি। আমি আপনাদের সকলকে আন্তরিকভাবে ধন্যবাদ জানাই যাঁরা এ লেখাটি ধৈর্য নিয়ে পড়েছেন এবং আপনাদের যথার্থ মতামত প্রদান করেছেন। ভবিষ্যতে এ সহযোগিতা আপনাদের কাছে আরো পাব বলেই বিশ্বাস করি । 
মিনহাজ আহমেদ, হুসাইন আল মামুন, ফেনা, সুপ্ত চিন্তা, লাল গাছ, পলাশ মিঞা, রশীদ জামিল, এ.বি.এম মহসীন, জহিরুল ইসলাম, কেশোয়ারা সুলতানা, ইনছানুর, দেবব্রত মুখোপাধ্যায়, কে.এম.ওমর ফারুক, প্রাজ্ঞজন, প্রামাণিক জালাল উদ্দিনসহ আপনাদের সবাইকে আন্তরিকভাবে ধন্যবাদ জানাই ।(কাউকে কাউকে তুমি সম্বোধন করতে পারলে ভাল লাগত কিন্ত আনুষ্ঠানিক উপস্থাপনে সর্বজনগ্রাহ্য শব্দ ব্যবহার করা যৌক্তিক, ব্যক্তি যতই স্নেহের হোক।) 

ঠিক এই সময়ে আমরা নাগরিকরা সর্বাধিকভাবে তিনটি চাপের মধ্যে নিজেদেরকে সমর্পন করতে বাধ্য হয়েছি যথা যানচাপ, জনচাপ ও কর্মচাপ। এই ত্রয়ীচাপকে মোকাবেলা করতে আমরা রীতিমত হিমশিম খাচ্ছি, অমানবিক হতে হতে যান্ত্রিক হয়ে পড়েছি। অন্যকারো ধাক্কাতে নয়, নিজেই নিজেকে যান্ত্রিক করেছি বা মেনেছি বলে। হার মেনেছি সময়ের কাছে, আন্তরিকতার কাছে, মায়া-ভালবাসার কাছে কারণ জয়ী হিসাবে নিজেকে দেখতে চাই বলে। ভীড়ের মধ্যে নিজেকে চিনে নিতে চাই বলে। এই জয়ী হওয়ার বাসনা মনুষ্যজাতির রোমে রোমে চিরপ্রথিত। যেদিন থেকে মানুষ নিজেকে নিজেই শ্রেষ্ঠ ভাবতে শিখল, যেদিন থেকে মানুষ অন্যকে নিজের নিচে দেখার বাসনা তৈরি করল। সেদিন থেকে জয়কে পাওয়া, জয়কে ছোঁয়া মানুষের একটি বড় কাজ হয়ে দেখা দিল। তবে জয় সেতো খারাপ নয়। জয়ী হওয়ার বাসনায় কোন অন্যায় নেই। সে জয় সত্য পথে থেকে আসুক। দাম্ভিক মুক্ত হয়ে আসুক। অন্যকে ক্ষতি না করে, অন্যকিছুকে ক্ষতি না করে ও আইনসিদ্ধ হয়ে আসুক আমরা তাকে সাদরে গ্রহণ করব। জয় পরাজয়ে আরেকটি বিষয় বলা খুব জরুরি যে, পৃথিবীর তাবৎ বিষয়কে জয় পরাজয় দিয়ে দেখতে চাওয়ার মধ্যে বিজ্ঞান নেই, যুক্তি নেই, যথাযথও নয়। এই চাওয়ার মধ্যে আরো বড় ধরণের যান্ত্রিকতার গন্ধ থাকে, সন্ধান থাকে। আমাদের মুখের ভাষা, পবিত্র এক অধ্যায় - জন্মদাত্রী মা থেকে পাওয়া। তার ভাল মন্দ নিয়ে তর্ক করা যাবে না এমন অনাধুনিক এবং অশিক্ষিত প্রকাশ আমার কাম্য নয়, সে দলেরও আমি নই। অগ্রসর হতে হবে যতটা জয় পরাজয় দিয়ে, তারও চেয়ে বেশী গভীরতা দিয়ে, বুদ্ধিমত্তা দিয়ে ও অধ্যয়ন-অধ্যবসায় দিয়ে, ভালবাসা দিয়ে কারণ ভাষা তো কেবল তলোয়ার খেলা নয় কিংবা বাকযুদ্ধও নয়। 
ভাষার ভিতরে বাস করেও আমরা এখন পর্যন্ত ’ভাসা ভাসা’ থেকে গেলাম। তাতে ক্ষতি নেই, জীবন-যাপনে বাধাও নেই। সমাজে-রাষ্ট্রে চলতে, চালাতে কোথাও অসুবিধা নেই। শিক্ষা ক্ষেত্রে, কর্ম ক্ষেত্রে, সাংসরিক ক্ষেত্রে, প্রেম-ভালবাসা-বিয়ে কোথাও তার আবশ্যকতা নেই। অন্তত রাষ্ট্র সেরকম হয়ে উঠেনি বা সেই রকম শিক্ষার ব্যবস্থা রাষ্ট্র এখনও ভাবতে পারেনি। তাতে কী, কথাটা হলো যিনি ক্ষতি মনে করবেন তিনি প্রয়োজনও মনে করবেন, তিনি এগিয়ে আসবেন, তিনিই ভাষাকে ভাসা থেকে গভীরে নিয়ে যাবেন। ব্যক্তি হোক কিংবা সংগঠন হোক এই চাওয়া একা তার কারণ তারই যে প্রয়োজন। বড় বিচিত্র এই হিসাব। যে হিসাবে রাষ্ট্র নিজেকে সেই দায়িত্বের বাইরের বলেই ভাবতে পারছে। নইলে বাংলা আজ খোদ তার দেশেই এত হতাদর কেন ? 
এখানে দুটো দিক কিংবা ভিন্নতা স্পষ্ট। রাষ্ট্র এবং ব্যক্তির চাওয়া পাওয়া। ভাষাকে গ্রহণযোগ্য পথে চলার রীতিনীতি ব্যক্তির করা সম্ভব নয় ফলে তা প্রয়োগের সম্ভবনার প্রশ্নই আসে না। যা চলছে যেভাবে চলছে তা ব্যক্তি বা ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠানের চেষ্টার ফসল। যা আগেও ছিল, বর্তমানে আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। অতএব ব্যক্তি মানুষকে ধরে ভাষার আশা নিরাশাকে এগিয়ে নিতে হবে। ফলে শেষ পর্যন্ত ব্যক্তির কাছে আবেদন -নিবেদন করতে হবে।
মনের সঙ্গে ঝুঝতে হবে সবার আগে যে, ভাষার সৌন্দর্য কতটা গ্রহণীয়, কতটা প্রয়োজন ,কতটা মানা চাই, কতটা মানা উচিৎ! ব্যক্তির সঙ্গে ভাষার সম্পর্ক কিভাবে- ভালবাসা-মায়ার নাকি ঔদাসীন্য কিংবা শত্রুতার! আদৌ কোন সম্পর্কবোধ মনে হয় কী-না ! যদিও ব্যক্তির ভাষা প্রকাশের ধরণে বোঝা যাবে ঐ ব্যক্তির সঙ্গে ভাষার সম্পর্ক কীরকম বা কতটা গভীর এবং বোঝা যাবে ভাষা তার কাছে কতটা আপন ! অবশ্য এটি পরিষ্কার বুঝতে চাইলে ভাষার একেবারে কাছে যেতে হবে তার ব্যবহারিক উপায় নিয়ে । বাংলার কথোপকথন, শব্দের উচ্চারণ, শব্দের বানান যে কোন ধরণের প্রকাশের মধ্য দিয়ে। ভাষার কোথাও কোন ধরণের প্রকাশে ভুল হলে আঘাত পাওয়া, অবসন্ন হওয়া, ব্যথা অনুভূত হওয়ার মধ্যে ভাষার সঙ্গে ভালবাসা, সুসম্পর্ক ফুটে ওঠে। এইটি বুঝতে ভাষাবিদ্ হতে হয় না, এক বস্তা সার্টিফিকেটও লাগে না - মন থাকতে হয়, গর্ব থাকতে হয়, দাবী থাকতে হয় । নিজেই বুঝে নিতে পারি নিজের কাছে। সত্যি সত্যি নিজের প্রতিক্রিয়া কীরকম হয়। সেখানে তো আর ফাঁকি নেই। আমি আমাকে ফাঁকি দেয়ার কী মানে ! যেখানে আমার ভালবাসা, আমার শ্রদ্ধা এবং আমার মায়ের স্বরূপ সন্ধানে ব্যাপৃত আমি। যেখানে চেতনায় নিঃস্বার্থ আরাধ্য কেবল। তার আগে বা পরে আর কিছূ থাকতে নেই, কিছু থাকতে পারে না। কেবল অনুভব, কেবল মুক্তির স্বাদ। কিন্তু মুক্তি অত সোজা নয় কারণ যখন যুক্তি এসে দাঁড়ায় আরো শক্ত হয়ে, অন্য কোন পোষাকে অন্য কোন ছায়ায়, অন্য কোন ভাবনা নিয়ে। যুক্তি এমনি এমনি আসে না তারও অনেক কারণ থাকে। ভাষাকে যখন কেউ ব্যবহার করতে চায় অন্যভাবে, ভাষাবেশী হয়ে। সুবিধাবাদী হয়ে, ব্যবসায়ী হয়ে, সাংস্কৃতিক কর্মী হিসাবেই কিংবা আধুনিকতার অন্য কোন পথ ধরে, সেই ব্যবহারের পক্ষে যুক্তি তৈরি করবেন ব্যবহারকারী অবশ্যই। তখনই তৈরি হয় আর অনেক কথা, অন্য মোড়কে সাজিয়ে, গলা বাজিয়ে। যেখানে ভাললাগা আর ভালবাসা খেই হারিয়ে ফেলে। যিনি ভাষাকে সুবিধায় বা ব্যবসায় নিয়ে ব্যবহার করছেন না তার বলবার কথা তখন আর থাকে না। কারণ ভাষার মধ্যেও দখলদারিত্ব থাকে সেটি সম্পন্ন হলে তখন করার কিছু থাকে না। যিনি লিখতে, পড়তে, বলতে ভুল করছেন না বা করতে চাইছেন না তার কোন কথা নেই । তাহলে? যখন ভুল করে চলা নয়, ভুলকে ভুল না বলে চলা। তখন ভুলের পক্ষে সোজা অস্বীকার। অস্বীকার হলেই তাকে প্রতিষ্ঠার জন্য তৈরি হবে অনেক অনেক যুক্তি। তবেই না জয় হবে। তবু ভুল স্বীকার করা অনেকের মত হয়ে, সাধারণ হয়ে থাকা তাদের কার্য নয়। ভুল স্বীকার মানেতো নিজের হাঁটা পথে নিজের বাধা। বরং ভুল অস্বীকার এর পক্ষে থাকবে কঠিন যুক্তি। থাকুক। মনে রাখতে হবে তা কখনও অকাট্য নয় এবং সেখান থেকেই আমাদেরকে সর্বজনীনকে বের করে আনতে হবে । 
একটি কথা খুব বলা হয় য়ে, ভাষা বহমান । নির্জলা সত্যি ! বহমান মানে শুধু চলা নয়, বেঁচে থেকে চলা। যোগ-বিয়োগের চলা হলেও যোগের হার বেশী থাকবে। তাহলেই বাড়বে। তা হচ্ছেও। আজ সারা পৃথিবীতে বাংলা ভাষী প্রায় ২৫ কোটি, সারা পৃথিবীর চতুর্থতম ভাষা। সংস্কৃত ভাষাও চলছে এখনও তবে সেখানে বিয়োগের হার অনেক বেশী। ফলে সংস্কৃত ভাষা আজ কেবল ডিগ্রি পাওয়ার ভাষা, মানুষের সঙ্গে এর সম্পর্ক নেই যার ফলে এই ভাল-মন্দে মানুষের কিছু যায় আসে না। অর্থ্যাৎ বহমান একবারে এমনি এমনি চলা নয়। সেখানে চিন্তা-চেতনা, ভাল-মন্দ,শিক্ষা-দীক্ষা সব যোগ হয়। ভাষার সঙ্গে নদীর উদাহরণ এইকারণে আসে। নদী মানে তার একা চলা নয়, একা থাকা নয়। দেশ-মানুষ-সমাজ সব কিছুকে নিয়ে, সব কিছুর মধ্য দিয়ে নদী। তার ভাঙনে বাধা দিতে হয়, পাশে গাছ লাগাতে হয়, তাকে ড্রেজিং করতে হয়, সেখানে আবর্জনা, তেল ফেলতে নিষেধ করা হয়। অনেক যত্নে একটি নদী বেঁচে থাকে। নদীর উৎসমুখ সমৃদ্ধ থাকতে হয় ।’ উৎসমুখে বাধাপড়ি মোরা পরিক্ষীণ, নষ্টপ্রাণ, গতিশক্তিহীন’- রবীন্দ্রনাথ। তবেই নদী মানুষের কাছে, ব্যবহারীর কাছে, সমাজের বুকে আরো সুন্দর হয়ে ফুটে ওঠে। 
একটা কথা মনে রাখা জরুরি যে, প্রযুক্তির প্রভাব একটা বড় প্রভাব। সেই প্রভাব কেবল ঐ প্রযুক্তিকে ঘিরেই সীমাবদ্ধ থাকবে তা নয়। সেই সময়ের সমাজ ব্যবস্থা, তার মানুষ, তার ভাষা সব কিছুর উপর প্রভাব ফেলবে। ফলে আমাদের এই সময়ে কম্পিউটার, মোবাইল যে ভাষায় গ্রন্থিত এবং পরিচিত সে ভাষার প্রভাব আমাদের ভাষায় পড়বে এটাই সত্যি। প্রযুক্তি থেকে আগত ভাষার এ মিশ্রণকে অস্বীকার যাবে না। সে ক্ষেত্রে কতটা প্রভাবিত হতে পারি সেইটুকু আমাদের বিচার-বিশ্লেষণে আনতে হবে । ভালটুকু অবশ্যই গ্রহণ করব এবং যতটুকু আমাদের ক্ষতি করবে ততটুকু আমাদের বাদ দিতে হবে। ধরা যাক, এই সময়ে আমরা আমাদের টেলিভিশনে অন্তত বিশটা হিন্দি চ্যানেলের অনুষ্ঠান উপভোগ করি । ফলে নিশ্চিত করে বলা যায় যে হিন্দি ভাষা অনেক সময় ধরেই কানে প্রবেশ করে। এর ফলে দেশের বাইরের একটি ভাষা সম্পর্কে আমাদের জানার আগ্রহ তৈরি হতে পারে এবং এই আগ্রহ মেটেই খারাপ কিছু নয়। এই আগ্রহ নিয়ে হিন্দি লেখা-পড়া-জানা চলতে পারে । ভাষা জানার পথে আরো একটি ভাষা যোগ হবে যা অবশ্য গৌরবজনক। কিন্ত লেখা-পড়া-বোঝা এই সমস্ত বাদ দিয়ে যদি আমার বাংলা বাক্যের শব্দের ফাঁকে ফাঁকে একটা করে হিন্দি শব্দ বসিয়ে দিই তাহলে আর ভাষা শিক্ষা হলো না, ভাষাকে সম্মান জানানো হলো না। এমনও শোনা যায় কিছু বাংলা শব্দকে খানিকটা বাঁকা-টেরা করে হিন্দির প্রস্বর ঢুকিয়ে বাংলা বলার চেষ্টা করছেন কেউ কেউ। এখানে দুই ভাষার বারটা বাজলেও নিজের বাংলা ভাষাকে অসম্মান করা হলো বেশী এবং ক্ষতিগ্রস্তও করা হলো যথেষ্ট। উপরন্তু হিন্দি ভাষাটিও লেখা-পড়া-বোঝার বাইরেই থেকে গেল। ইংরেজীতে ভাষা নিয়ে এই খেলা অনেক বেশী শোনা যায়, করতেও দেখা যায়। যেমন তোর বাড়িতে গেলাম বাট তোকে পেলাম না সো চলে এলাম। তাতে কী দাঁড়াল ! একই সঙ্গে বাংলার সর্বনাশ হলো, ইংরেজীও ক্ষতিগ্রস্থ হলো। আর যে ব্যক্তি এই বাক্যটি ব্যবহার করলেন তাঁকেই বা কোন শ্রেণিতে ফেলা যায়। জামা আর পাজামায় পোষাকটা কেমন হলো। 
বাংলা কথায় কিংবা লেখায় অতি স্বাধীনতার ফলে বাংলার অনেক শব্দ আজ বিকলাঙ্গ। এই ক্ষতির মূল্য কে দেবে? উদাহরণ হিসাবে একটি বাক্য বলা যায়,ধরা খাওয়া। এই ব্যবহারকে শিষ্ট ব্যবহার বলা যায় না। অথচ এই ধরণের কথা বলা হচ্ছে। প্রথমে কিছু কিছু ছিল। এখন ঘরে ঘরে পিতা-পুত্রে, মাতা-কন্যায়। এধরণের কথা চালু হতে সময় লাগে না। আরো আগে মেয়েদের দেখে কথা হতমাল যায়। সভ্যজগতের কোন মানুষ এই ব্যবহার করতে পারে? অথচ এই ব্যবহার হয়। শব্দের কোন দোষ নেই অথচ মানুষের কারণে এই শব্দগুলি আজ বিকলাঙ্গ। এই স্বাধীনতা ভোগ করা উচিৎ নয়। কাম্য নয়। তাহলে কোথাও নিয়ম তৈরি হওয়া চাই। আর তা মানতে হবে, মানাতে হবে। তবেই সুস্থ, তবেই শান্তি, তবেই এগিয়ে চলা ।

গোলাম সারোয়ার
উচ্চারণ বিষয়ক প্রশিক্ষক ও নির্দেশক
আবৃত্তি ও নাট্যশিল্পী এবং সংস্কৃতিকর্মী

শুদ্ধ উচ্চারণ বিষয়ক বক্তৃতা : অন্ত্য ‘অ’ এর সূত্র - অধ্যাপক নরেন বিশ্বাস



পর্ব : পাঁচ

শুরু হলো অন্ত্য-অ

গত সপ্তাহে হঠাৎ করে অচেতন হয়ে যাওয়ায় স্যারকে বারডেম হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়েছিল। উচ্চারণের ক্লাসটি আর হবে কি না তা নিয়ে সন্দেহ ছিল বেশ। কিন্তু এক সপ্তাহেই ফিরে আসবেন তা ভাবতে পারে নি কেউ। অন্য দিনের মতো চটপটে ভাব না থাকলেও গলার জোর কমে নি স্যারের। ‘চলা’ ধীর হলেও ‘গলা’ এবং ‘বলা’র দাপট আছে আগের মতোই। চেয়ারে বসে থেকেই হাঁক দিলেন, আদ্য-অ এবং মধ্য-অ এর পর এবার আমরা অন্ত্য-অ-এর সূত্র আলোচনা করবো। লেখ তোমরা :
প্রথম সূত্র : শব্দের শেষে যদি অ-কারান্ত যুক্ত ব্যঞ্জনবর্ণ থাকে তা হলে তার প্রথমটি হসন্ত এবং দ্বিতীয়টি সাধারণত: ও-কারান্ত উচ্চারিত হয়।যেমন-
যুক্ত - যুক্ + তো - যুক্তো
শক্ত - শক্ + তো - শক্তো
ভক্ত - ভক্ + তো - ভক্তো
রক্ত - রক্ + তো - রক্তো
যত্র - যত + ত্রো - যত্ত্রো
তত্র - তত্ + ত্রো - তত্ত্রো
পত্র - পত্ + ত্রো - পত্ত্রো
মাত্র - মাত্ + ত্রো - মাত্ত্রো
গঞ্জ - গন্ + জো - গন্জো
কক্স - কক্ + সো - কক্সো
ভণ্ড - ভন্ + ডো - ভন্ডো
অভ্যাসবশত একটু উঠে দাঁড়ালেন। আগের মতো শরীরে জোর না থাকায় পায়চারী করার চেষ্টা করেও হাঁটতে পারলেন না। চেষ্টা আর না বাড়িয়ে বলতে শুরু করলেন দ্বিতীয় সূত্র।
দ্বিতীয় সূত্র : ত কিংবা ইত প্রত্যয়যোগে গঠিত শব্দে অন্তিম-অ রক্ষিত এবং ও-কারান্ত উচ্চারিত হয়ে থাকে। যেমন :
নত - নতো
গত - গতো
মত - মতো
যত - যতো
তত - ততো
শতশত - শতোশতো
গঠিত - গোঠিতো
রক্ষিত - রোক্খিতো
পালিত - পালিতো
দিক্ষিত - দিক্খিতো
মোহিত - মোহিতো
লোলিত - লোলিতো
নিশ্চিত - নিশ্চিতো
নির্মিত - নির্মিতো
মৌসুমীর মাঝে মাঝে ফোড়ন কাটার অভ্যাস আছে। ফট্ করে বলে ফেললো স্যার, আমরা তাহলে এখন থেকে ভাত্কে ভাতো, হাত্কে হাতো বলবো? দুম্ করে বোমা ফাটার মতো হাসিতে ফেটে পড়লো ক্লাসশুদ্ধ সবাই। কোনরকম অপ্রস্তুত না হয়ে স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে বলে চললেন স্যার, যে সকল শব্দ বিশেষ্য রূপে ব্যবহৃত হয়, সে সকল শব্দে সাধারণত হসন্ত উচ্চারিত হয়। তাছাড়া মানুষের মুখের ভাষার ব্যবহারে কতকগুলো শব্দের উচ্চারণ বদল হয়ে যায়। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায় :
হাত - হাত্
ভাত - ভাত্
অতীত - ওতিত্
উচিত - উচিত্
মৌসুমী এখনো হাল ছাড়ে নি। আগের মতো উদ্ধত ভঙ্গিতে বলে উঠলো, স্যার আপনি বললেন মোহিত উচ্চারণ মোহিতো হবে। কিন্তু আমরা তো কবি মোহিত লাল মজুমদারকে কখনো মোহিতো লাল মজুমদার বলি না। এবার আর কেউ হাসলো না। প্রশ্নটা খুবই সিরিয়াস ভেবেই বোধহয় চুপ করে থাকলো সকলে। কেউ না হাসলেও স্যারের মুখভর্তি হাসি ছড়িয়ে পড়লো। মৌসুমীর দিকে তর্জনী উঁচু করে বোঝাতে শুরু করলেন, তোমার জিজ্ঞাসাকে কটাক্ষ না করে সহজ ভাষায় প্রশমিত করার চেষ্টা করা দরকার। আমি আগে কোথাও কোথাও যেমনটি বলেছি, বিশেষ্য বা নামের ক্ষেত্রে এখানেও ব্যতিক্রম লক্ষ্য করা যায়। এ ক্ষেত্রে নাম বা পদবী হলে সাধারণত অন্তিম-অ টি হসন্ত উচ্চারিত হয়। যেমন :
রনজিত রক্ষিত - রোক্খিত্
মাধুরী দিক্ষিত - দিক্খিত্
আনন্দচন্দ্র পালিত - পালিত্
লোলিত মোহন নাথ - লোলিত্
মোহিত লাল মজুমদার - মোহিত্
শম্পা খুব সহজ সরল। ওর প্রশ্ন করার ধরণটাও বেশ সাধারণ। স্যার একটু থামতেই উঠে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করলো, আমরা নিশ্চিত্ বলবো না নিশ্চিতো বলবো? শম্পার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে স্যার বলতে লাগলেন, সূত্রমতে আমরা এখনো পর্যন্ত নিশ্চিত কে নিশ্চিতোই বলবো। কিন্তু এখন অনেকেই নিশ্চিত্ বলছেন দ্বিধাহীন চিত্তে। হয়তো এমন একদিন আসবে, যখন মুখের ভাষার গতিময়তো নিশ্চিতো কে নিশ্চিত্, স্থগিতো কে স্থগিত্ করে ফেলবে। তখন আমাদের মেনে নেওয়া ছাড়া আর কোনো গত্যন্তর থাকবে না।
এতক্ষণে লিকার চায়ের প্রতি স্যারের তৃষ্ণা তুঙ্গে উঠেছে। কিন্তু রইস এখনো চা নিয়ে ঢুকছে না দেখে বেশ জোরে হাঁক দিলেন। দরজার বাইরে থেকে রইসের লাজনম্র মুখখানা ভিতরে চলে এলো। হাতের ইশারায় স্যারকে আশ্বস্ত করে দ্রুত বেরিয়ে গেল আবার। যেন কিছুই ঘটেনি এমনভাবে বলতে লাগলেন ফের।
তৃতীয় সূত্র : বাঙলা ভাষাতে এমন কিছু শব্দ রয়েছে যেগুলি বিশেষ্যরূপে ব্যবহৃত হওয়ার সময় হসন্ত উচ্চারিত হয়, কিন্তু বিশেষণ রূপে ব্যবহৃত হওয়ার সময় ও-কারান্ত উচ্চারিত হয়।
বিশেষ্য
ভাল (কপাল) - ভাল্
কাল (সময়) - কাল্
বিশেষণ
ভাল (উত্তম) - ভালো
কাল (রঙ) - কালো
চতুর্থ সূত্র : বিশেষ্যবাচক শব্দের শেষে ‘হ’ এবং বিশেষণবাচক শব্দের শেষে ‘ঢ়’ থাকলে সাধারণত ও-কারান্ত উচ্চারিত হয়। যেমন :
বিবাহ - বিবাহো গাঢ় (গাঢ়ো)
কলহ - কলোহো দৃঢ় (দৃঢ়ো)
বিরহ -বিরহো মূঢ় (মুঢ়ো)
গ্রহ - গ্রোহো প্রগাঢ় (প্রোগাঢ়ো)
স্নেহ - স্নেহো দেহ - দেহো
মৌসুমী মনে হয় এখনো শান্ত হতে পারে নি। আবারো সুযোগ পেয়ে ফস্ করে বলে ফেললো, স্যার তাহলে আষাঢ়কে আষাঢ়ো বলতে হবে? এবারে স্যার বেশ বিরক্ত হলেন। গলা দিয়ে গাঁক করে শব্দ বেরিয়ে এলো। বিব্রত মৌসুমীকে আরো চটানোর জন্য দীপু পেছন থেকে সহানুভূতির ছলে চুক্ চুক্ শব্দ করতেই ধপাস করে বসে পড়লো মৌসুমী। ধীরলয়ে স্যার বলতে লাগলেন, বিশেষণ বাচক শব্দের শেষে ‘ঢ়’ থাকলে ও-কারান্ত উচ্চারণ করতে হয়। কিন্তু আষাঢ় বিশেষণবাচক নয়, বিশেষ্যবাচক শব্দ। তাই এক্ষেত্রে আষাঢ়কে আষাঢ় বলা হয়। একগ্লাস লাল চা, বাটিতে ছোলামুড়ি ও দুটো সবরি কলা নিয়ে রইস পাশের চেয়ারে রাখলো। ক্লান্ত যতীন স্যার বসে পড়লেন চেয়ারে। রইসের দিকে সস্নেহ দৃষ্টি মেলে মৃদু ধন্যবাদ দিলেন যেন।

অন্ত্য-অ-এর শেষ সূত্র

ভিতরে ঢুকেই হাঁক দিলেন, জহির, তুমি বলোতো, অন্ত্য-অ-এর সূত্র শেষ হয়েছে কি না? প্রশ্নের ধরণ বুঝতে না পেরে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে দাঁড়িয়ে থাকলো জহির। শম্পা খুবই সপ্রতিভ। জহিরকে রক্ষা করার জন্য চট্ করে বলে ফেললো, স্যার, অন্ত্য-অ-এর চারটি সূত্র বলা হয়েছিল। আমার মনে হয়, আরো কয়েকটি সূত্র বাকী রয়েছে। শম্পার কথায় স্যার বেশ খুশী হলেন মনে হলো । ওর কথা লুফে নিয়ে বললেন, হ্যাঁ, এবারে অন্ত্য-অ-এর পরবর্তী সূত্র।
পঞ্চম সূত্র : বাঙলা ভাষার যে সকল শব্দের বানানে বিসর্গ ছিল, কিন্তু বর্তমান বানানে বিসর্গ বিলুপ্ত হয়েছে, সেসকল শব্দের উচ্চারণ সাধারণত ও-কারান্ত হয়। যেমন :-
প্রথমত - প্রোথমত (প্রোথোমতো)
বস্তুত - বস্তুত (বোস্তুতো)
দ্বিতীয়ত - দ্বিতীয়ত (দিতিয়তো)
সতত -সতত (সততো)
প্রণত - প্রণত (প্রনতো)
প্রায়শ - প্রায়শ (প্রায়শো)
পায়চারী বন্ধ করে চেয়ারে বসে পড়লেন। মিনিট খানেক পরে ক্লাসরুমের স্তব্ধতা ভেদ করে গমগমে স্বরে বলে উঠলেন পুনরায়, পাঁচ নম্বর সূত্রের পর ছয় নম্বর সূত্রে প্রবেশ করতে যাচ্ছি আমরা। এর মধ্যে তোমাদের মনে কোনো প্রশ্ন জেগে থাকলে বলতে পারো। মিনিট দুয়েক অপেক্ষা করে কোনো উত্তর পেলেন না স্যার। হাসিমুখে উঠে দাঁড়ালেন আবার। হাঁটতে হাঁটতে শুরু করলেন পরবর্তী সূত্র।
ষষ্ঠ সূত্র : বাঙলা ভাষায় ‘তর’ এবং ‘তম’ প্রত্যয়যোগে গঠিত শব্দে শেষের ‘অ’ সাধারণত রক্ষিত থাকে এবং ও-কার উচ্চারিত হয়। যেমন :
উচ্চতর - উচ্চোতরো
উচ্চতম - উচ্চোতমো
অধিকতর - অধিকোতরো
গভীরতর - গভিরোতরো
বৃহত্তম - বৃহত্তমো
ক্ষুদ্রতর - ক্ষুদ্দ্রতরো
ক্ষুদ্রতম - ক্ষুদ্দ্রতমো
শম্পা আবার উঠে দাঁড়ালো। দু-হাত বুকের কাছে উঠিয়ে খুব আস্থার সাথে উচ্চারণ করলো, স্যার, তাহলে আমরা এখন থেকে উত্তমকে উত্তমো বলবো। যতীন স্যার কিন্তু মোটেই রাগ করলেন না। সবার হাসির হুল্লোড়ের মাঝে গলা চড়িয়ে বললেন, শম্পার কথায় হাসির কিছু নাই।
ও, সরলভাবে সূত্র অনুসরণ করে কথাটি বলে ফেলেছে। তাতে ওর কোনো দোষ দেখি না। মূল ব্যাপারটি হচ্ছে, এটি একটি ব্যতিক্রম। উত্তম-এর উচ্চারণ হবে উত্তম্। সে যাকগে, এবারে আমরা সপ্তম ও শেষ সূত্রে প্রবেশ করবো।
সপ্তম সূত্র : ঙ, ং, ঋ-কার, ঐ-কার, ঔ-কার এর পরে অ-কারান্ত বর্ণ থাকলে সাধারণত শেষের বর্ণটি ও-কারান্ত উচ্চারিত হয়। যেমন-
ঙ : 
অঙ্ক - অঙ্কো
বঙ্ক - বঙ্কো
শঙ্খ - শঙ্খো
ং : 
অংশ - অংশো
বংশ - বংশো
ধ্বংশ - ধ্বংশো
কংশ - কংশো
ঋ-কার : 
কৃশ - কৃশো
বৃষ - বৃশো
তৃণ - তৃনো
নৃপ - নৃপো
মৃগ - মৃগো
ঐ-কার : 
দৈব - দোইবো
শৈব - শোইবো
স্ত্রৈণ - স্ত্রোইনো
জৈন - জোইনো
কৈল - কোইলো
হৈল - হোইলো
তৈল - তোইলো
ঔ-কার :
গৌণ - গোও্নো
মৌন - মোও্নো
ধৌত - ধোও্তো
ভৌত - ভোও্তো
ভৌম - ভোও্মো
পৌর - পোওরো
সৌর - সোওরো
গৌর - গোওরো
একটানা এতগুলো নিয়ম বলতে বলতে স্যার হাঁফিয়ে উঠেছিলেন। স্যারেরতো শুধু বলা নয়। বলার সঙ্গে চলাও বাদ যায় না। বলা চলা আর গলা এই তিন নিয়েইতো স্যারের আসল কলা। চেয়ারে বসে পড়লেন ধপ্ করে। চা ঠাণ্ডা হয়ে গিয়েছিল। আধঘন্টা আগে দিয়ে যাওয়া চা গরম থাকে কি করে? ঠাণ্ডা চায়ে মুখ দিয়ে একটু বিকৃত হলো স্যারের মুখ। তারপর সামলে নিয়ে পরম তৃপ্তিভরে লম্বা চুমুক দিয়ে গ্লাসের অর্ধেক চা শেষ করে ফেললেন।
শম্পার যেন আজ কি হয়েছে। বারবার উঠে দাঁড়ানোর প্রবণতা আবার তাকে পেয়ে বসলো। স্যারের নিরবতার সুযোগে উঠে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করলো, স্যার, এক্ষেত্রে কোন ব্যতিক্রম নেই? সাথে সাথে কোন উত্তর না দিয়ে হাফপ্লেটে পড়ে থাকা ডাবল্ পান মুখে পুরে কুচমুচ শব্দ তুলে সামনে তাকালেন। হা করে হাতের তালু থেকে বাবাজর্দার দলা মুখের ভিতর ছুঁড়ে দিলেন। চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকা শম্পাকে হাতের ইশারায় বসতে বলে উঠে দাঁড়ালেন। হাঁটতে হাঁটতে বললেন, ব্যতিক্রমতো অবশ্যই আছে। যেমন :
খৈল - খইল্
দৌড় - দোউড়্
পৌষ - পোউষ্
গৌড় - গোউড়্
হঠাৎ পেছন ফিরে চেয়ারের পাশে পড়ে থাকা কাপড়ের ঝোলাটা কাঁধে তুলে নিলেন। ঝট্ করে ঘুরেই চলতে লাগলেন দরজার দিকে। কেউ কিছু বললো কি না সে ব্যাপারে ভাবার কোন প্রয়োজন বোধ করলেন না স্যার।
(চলবে)

রবিবার, ২৩ অক্টোবর, ২০১১

কাক কখনো আর একটা কাককে মারে না কিন্তু মানুষ মানুষকে মারে, ছাত্ররা মেরে ফেলে আর এক ছাত্রকে

এ কেমন শিক্ষা অর্জন করছি আমরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে?
ছাত্রকে পিটিয়ে মারার শিক্ষা কি দেয়া হয় কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে, মেডিকেল কলেজে?
দেশ পরিবর্তন, মানুষ পরিবর্তনের বুলিগুলো কি ফাঁকা বুলি হযে যাবে আজও।
তিরানব্বই সালে ফিডব্যাক এর মাকসুদ গানটা গেয়েছিলো।
আজও তা কতটা বাস্তব এই বাংলাদেশে।
আপনারাই বিচার করুন।


কোথাও রোমাঞ্চ নেই, খাঁটি করুণ বাস্তবতা এবং এই বাংলাদেশের কথা বিশ্ববিদ্যালয় সারারাত অবিরাম গোলাগুলি আর পরদিন বিভৎস মরদেহের দেখি প্রতিকৃতি তাই পত্রিকার আজ বাড়তি কাটতি শুনি প্রতিবাদ প্রতিরোধ কর্মসূচি মিছিল শেষে পণ্ড হলো ভণ্ড শোকসভার তীব্র নিন্দা কড়া প্রতিবাদের তরল উৎকণ্ঠা সমবেদনার গভীর অভয় দেখি চলে প্রাগৈতিহাসিক ভাবধারা আর আমি শুনি মা-বোনের কান্না আর বাবার গোঙানি শুনি গুপ্ত প্রেমিকার আর্তনাদ আর নির্লজ্জ আস্ফালনে খুনিদের জয়ধ্বনি গঠিত হয়েছে উচ্চ পদস্থ তদন্ত কমিটি সৌজন্যমূলক সান্তনার সমিতি আর আমলাতন্ত্রের জটিলতার মুখে গণতন্ত্র কেন বিপদগামী উচ্চ পদস্থ তদন্ত কমিটি ন্যায় বিচার পাবার আশ্বাসের সমিতি আর ন্যায় বিচার যাতে কেউ না পায় রয়েছে উচ্চ পদস্থ তদবিরি ফটাশ করে ফাটলো খুলি আর এক তরুণীর ট্রাকের চাপাতলে মৃত্যুর বর্ণনা ভয়ঙ্করী তার বান্ধবীরা তুললো নতুন দাবী চাই স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারাণ্টি পত্রিকাতে বান্ধবীদের শুধু কান্নার ছবি আর উত্তেজক স্মরণসভায় আছে কিছু ফাঁকা বুলি ট্রাকের মালিকরা রেখেছে জিম্মি কেন জবাব চাই নেতা-নেত্রী আর আমি শুনি মা-বোনের কান্না আর বাবার গোঙানি শুনি গুপ্ত প্রেমিকার আর্তনাদ আর নির্লজ্জ আস্ফালনে খুনিদের জয়ধ্বনি গঠিত হয়েছে উচ্চ পদস্থ তদন্ত কমিটি সৌজন্যমূলক সান্তনার সমিতি আর স্বর্গের নাম পাল্টে স্মরণ করি হয়ে গেছে যারা প্রাণহানি উচ্চ পদস্থ তদন্ত কমিটি এ মিথ্যো আশার আশ্বাসের সমিতি আর সত্য মিথ্যা বেঁচে রবে জানবে কখনো বাঙালি উচ্চ পদস্থ তদন্ত কমিটি বিরানব্বই এর একুশে জুনে প্রেসক্লাব অভ্যন্তরে বেত্রাঘাত, রাইফেল বাট আর কাঁদুনে গ্যাসে বজ্রকণিকার ঠা ঠা পড়লো মুক্তচিন্তার মন্দিরে মন্ত্রী মহোদয়ের অসীম দয়ায় সাংবাদিক হাসপাতালে শত্রু-মিত্র ভাগ করে দুঃখ একই শয়ন কক্ষে আবার পত্রিকার আজ বাড়তি কাটতি আর মালিক পক্ষ পাজেরো জিপে আমি শুনি মা-বোনের কান্না আর বাবার গোঙানি শুনি নিস্পাপ শিশুর আর্তনাদ আর নির্লজ্জ আস্ফালনে পুলিশের বাড়াবাড়ি গঠিত হয়েছে উচ্চ পদস্থ তদন্ত কমিটি দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির প্রতিশ্রুতি আর দৃষ্টান্ত কখনো চোখে দেখিনি, আশাও করি নি উচ্চ পদস্থ তদন্ত কমিটি উচ্চপদে গালাগালি আর দলাদলী আর গণতন্ত্রের নামে হচ্ছে ডাকাতি দোহাই তোমার মুক্ত বাজারের অর্থনীতি আর এই প্রচণ্ড দলনে ছেড়ে দাও আমাদের, আমরা অনেক দেখেছি আমরা অনেক দেখেছি। আমরা অনেক দেখেছি।

সোমবার, ১৭ অক্টোবর, ২০১১

শুদ্ধ উচ্চারণ বিষয়ক বক্তৃতা : মধ্য ‘অ’ এর সূত্র - অধ্যাপক নরেন বিশ্বাস

পর্ব : চার এবার মধ্য - অ এর সূত্রাবলী অনেকদিন পর স্যারকে আজ বেশ ফ্রেশ দেখাচ্ছে। চুল-দাড়ি ছোট করে ছেঁটে পাঞ্জাবীর বদলে হাফ শার্ট পরে ফিটফাট হয়ে এসেছেন। কাঁধের ঝোলাটিও উধাও। তবে পায়ের স্যাণ্ডেল আগেরটিই আছে।গাম্ভীর্য ভেদ করে দাঁড়িয়ে পড়লেন। কোমল হাসি সারা মুখমণ্ডলে। চেয়ারে বসে থেকেই বলতে শুরু করলেন, আদ্য-অ-এর পর আজ আলোচনা করবো মধ্য-অ- এর সূত্র। নড়েচড়ে বসলাম। উচ্চারণ সম্পর্কে যে ভীতি ছিল, তা কেটে গেছে কবে। এখন উচ্চারণের সূত্র শুনতে শুনতে মজার নেশায় পেয়ে বসেছে যেন। আদ্য-অ-এর নিয়মকানুন ঠোঁটের আগে ঝুলে থাকছে সবসময়। একজন আরেকজনকে উচ্চারণ দিয়ে ঠকানোর খেলা জমে উঠেছে এই ক’দিনে। স্যার গলা চড়ালেন আরো একটু। এখন যেটি আলোচনা করবো, তাকে তোমরা মূল সূত্র না বলে প্রাসঙ্গিক সূত্র বলতে পারো। এই সূত্রটি হলো : যে সকল কারণে শব্দের আদ্য-অ, ও-কারন্ত উচ্চারিত হয়, তার সবগুলি সূত্রই মধ্য-অ এর ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রযোজ্য। যেমন- ই-কার আদ্য-অ-এর ক্ষেত্রে মতি (মোতি) মধ্য-অ-এর ক্ষেত্রে সুমতি (সুমোতি) দুর্মতি (র্দুমোতি) অগতি (অগোতি) প্রগতি (প্রোগোতি) কুমতি (কুমোতি) উ-কার/ঊ-কার/ঋ-কার আদ্য-অ-এর ক্ষেত্রে তনু (তোনু) ময়ুর (মোয়ুর) মধ্য-অ-এর ক্ষেত্রে সুতনু (সুতোনু) সুমধু (সুমোধু) পথতরু (পথোতোরু) পুত্রবধু (পুত্ত্রোবোধু) মনময়ুর (মনমোয়ুর) সুমসৃন (সুমোস্সৃন) অমসৃন (অমোস্সৃন) ঈ-কার আদ্য-অ-এর ক্ষেত্রে ননী (নোনি) মধ্য-অ-এর ক্ষেত্রে জননী (জনোনি) ধরনী (ধরোনি) সরণী (সরোনি) বরনী (বরোনি) ঘরনী (ঘরোনি) য-ফলা বিলুপ্ত আদ্য-অ-এর ক্ষেত্রে পর্যায় (র্পোযায়) মধ্য-অ-এর ক্ষেত্রে আশ্চর্য (আশ্চোরযো) ঐশ্বর্য (ঐর্শোযো) সৌন্দর্য (সৌর্ন্দোযো) সুমি চুপচাপ বসে স্যারের বক্তৃতা শুনতে অভ্যস্ত। কোনদিন একটি কথাও বলে না। সেজন্য কারও নজরে পড়েনি সে। আমরাও তাকে খুব একটা খেয়াল করিনি কোনদিন। আজ দুম্ করে প্রশ্ন করলো, স্যার, আদ্য-অ-এর সূত্র অনুযায়ী মধ্য-অ তেও একই নিয়ম প্রযোজ্য হলে আলাদাভাবে আলোচনা করার আর দরকার কি? বললেই হতো, আদ্য, মধ্য এবং অন্ত সকল অ-এর ক্ষেত্রে একই নিয়ম প্রযোজ্য। আলাদা আর কোন সূত্র নেই। স্যার একটু থমকে গেলেন। পর মুহূর্তেই খুব স্বাভাবিক কণ্ঠে বললেন, এই মেয়ে, বোকার মতো কথা বলোনাতো! তোমাকে কে বলেছে, মধ্য-অ-এর ক্ষেত্রে কোন মৌলিক সূত্র নেই? এর পরইতো সেই আলোচনায় আসব। সুমি এদিক ওদিক তাকিয়ে চুপ্সে গেল একটু। কোন কথা না বলে হাবার মতো চুপচাপ তাকিয়ে থাকলো স্যারের দিকে। একটু মায়ামাখা সুরে স্যার বললেন, সে যাকগ্, এবার আমরা মধ্য-অ-এর মৌলিক সূত্র আলোচনা করবো। সূত্র : এক তিনবর্ণে গঠিত শব্দের প্রথম বর্ণটি যদি অ-কারান্ত, আ-কারান্ত, এ-কারান্ত কিংবা ও-কারান্ত হয়, তাহলে মাঝখানের অ-কারান্ত বর্ণটি সাধারণত ও-কারান্ত উচ্চারিত হয়। এখানে লক্ষ্যণীয় যে, শর্ত চারটি হলো : অ-কারান্ত, আ-কারান্ত, এ-কারান্ত, ও-কারান্ত। আদ্য বর্ণ অ-কারান্ত অমন (অমোন্) গঠন (গঠোন্) যখন (যখোন্) তখন (তখোন্) পঠন (পঠোন্) ফসল (ফসোল্) ফলন (ফলোন্) কলম (কলোম্) মশক (মশোক্) দলন (দলোন্) মলন (মলোন্) শতক (শতোক্) যতন (যতোন্) রতন (রতোন্) আদ্য বর্ণ আ-কারান্ত আমন (আমোন্) কাজল (কাজোল্) আসল (আসোল্) কাগজ (কাগোজ্) পাগল (পাগোল্) ছাগল (ছাগোল্) জাগর (জার্গো) নাগর (নার্গো) সাগর (সার্গো) আসন (আসোন্) বাসন (বাসোন্) আদ্য বর্ণ এ-কারান্ত চেতন (চেতোন্) বেতন (বেতোন্) কেতন (কেতোন্) লেহন (লেহোন্) শেখর (শের্খ) কেশর (কের্শো) আদ্য বর্ণ ও-কারান্ত ওজন (ওজোন্) ভোজন (ভোজোন্) শোধন (শোধোন্) বোধন (বোধোন্) তোষণ (তোষোন্) লোচন (লোচোন্) রোচন (রোচোন্) দীপু বরাবরই বুদ্ধিদীপ্ত প্রশ্ন করে, আজকেও সুযোগ নিল। ধীরে সুস্থে উঠে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করলো, স্যার, এই নিয়মগুলো কি সবক্ষেত্রেই প্রযোজ্য, নাকি কোন ব্যতিক্রমও আছে? চোখ বন্ধ করে পান চিবোতে শুরু করেছিলেন স্যার। যেন ঘুম থেকে উঠলেন, এমনভাবে চোখ মেলে চাইলেন দীপুর দিকে। পান চিবোতে চিবোতে বলতে লাগলেন, হ্যাঁ, হ্যাঁ দীপু ঠিক সময়ে প্রশ্নটি করে আমাকে বাঁচিয়েছে। ব্যতিক্রম অবশ্যই আছে। কোথায় ব্যতিক্রম হয়, সে ব্যাপারটি তোমরা এবার লিখে নাও। তিনবর্ণে গঠিত শব্দের প্রথম বর্ণটি যদি না বোধক অ-হয়, কিংবা সহিত অর্থে স-হয়, তাহলে মাঝখানের অ-কারান্ত বর্ণটি ও-কারান্ত উচ্চারিত না হওয়াই বাঞ্ছনীয়। যেমন : অচল (অচল্) অজর (অর্জ) অমর (অর্ম) অমল (অমল্) অবশ (অবশ্) অবলা (অবলা) সরস্ (সরস্) সরব (সরব্) সফল (সফল্) সজল (সজল্) অটল (অটল্) অচল (অচল্) সুমন ঢুকলো গরম চায়ের গ্লাস হাতে। সেদিকে স্নিগ্ধ দৃষ্টি মেলে তৃপ্তির হাসি দিলেন স্যার ছোট্ট করে। চায়ের গ্লাসে সশব্দে চুমুক দিয়ে উঠে দাঁড়ালেন আবার। গ্লাস হাতে হাঁটতে হাঁটতে মধ্য -অ-এর দ্বিতীয় ও শেষ সূত্র লেখার নির্দেশ দিয়ে বলতে শুরু করলেন। সূত্র : দুই একাধিক সংস্কৃত শব্দ বা তৎসম শব্দ সমাসবদ্ধ পদে পরিণত হলে, পূর্বপদের শেষের অ-কারান্ত বর্ণটি ও-কারান্ত উচ্চারিত হয়। যেমন : পথ (পথ্) থেকে পথচারী (পথোচারি) মেঘ (মেঘ্) থেকে মেঘমালা (মেঘোমালা) জল (জল্) থেকে জলচর (জলোচর) শ্রম (শ্রম্) থেকে শ্রমমন্ত্রী (শ্রমোমোন্ত্রি) বন (বন্) থেকে বনভূমি (বনোভুমি), বনচারী (বনোচারি), বনবাসী (বনোবাসি) লোক (লোক্) থেকে লোকসাহিত্য (লোকোসাহিত্ত্য) গণ (গণ্) থেকে গণব্যবহার (গনোব্যবহার), গণনাট্য (গনোনাট্ট্য), গণনায়ক (গনোনায়ক্) চায়ের গ্লাসটি হাত থেকে চেয়ারের উপরে রেখে পাশের খালি চেয়ারটিতে ধপ্ করে বসে পড়লেন। দীপুর দিকে তাকিয়ে কপাল কুঁচকে রহস্যময় দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বললেন, এবারো কিন্তু ব্যতিক্রম আছে। যেমন : রাজ (রাজ্) থেকে রাজহংস (রাজহংসো), রাজহাঁস (রাজহাঁস), রাজকন্যা (রাজকননা), রাম (রাম্) থেকে রামচন্দ্র (রামচন্দ্রো)

বৃহস্পতিবার, ১৩ অক্টোবর, ২০১১

শুদ্ধ উচ্চারণ বিষয়ক বক্তৃতা : আদ্য ‘অ’ এর অবশিষ্ট সূত্রাবলী - অধ্যাপক নরেন বিশ্বাস


পর্ব : তিন

আদ্য ‘অ’ এর অবশিষ্ট সূত্রাবলী

আদ্য অ-এর দ্বিতীয় সূত্র : শব্দের প্রথমে যদি অ-কারান্ত বর্ণে র-ফলা যুক্ত হয়, তাহলে সাধারণত ও-কারান্ত উচ্চারিত হয়। 
যেমন : প্রথম (প্রোথোম্), প্রভাত (প্রোভাত্), ব্রত (ব্রোতো), শ্রম (শ্রোম্), ভ্রমণ (ভ্রোমোন্), ভ্রমর (ভ্রোর্মো), দ্রষ্টা (দ্রোষ্টা), স্রষ্টা (স্রোষ্টা)।
ব্যতিক্রম : র-ফলা যুক্ত বর্ণটির পরে যদি ‘য়’ আসে, তাহলে কিন্তু অ-কার ঠিক থাকে। যেমন : ক্রয় (ক্রয়), ত্রয় (ত্রয়), আশ্রয় (আস্স্রয়)।
উঠে পায়চারী করতে করতে স্যার আবার শুরু করলেন কথা। এখন যে সূত্রটি আলোচিত হবে সেটি তোমাদের দৈনন্দিন জীবনের জন্য খুবই অপরিহার্য। এটি বাদ দিয়ে একটি দিনও তোমাদের চলবে না। সুতরাং এই সূত্রটির ব্যাপারে সচেতন থাকলে উচ্চারণের ক্ষেত্রে তোমরা বহু গুরুত্বপূর্ণ ত্রুটি সংশোধনের সুযোগ পাবে।

আদ্য অ-এর তৃতীয় সূত্র : সাধুভাষার পূর্ণাঙ্গ শব্দে কিংবা ক্রিয়াপদে ই-কার কিংবা উ-কার ছিল, চলিত ভাষার সংক্ষিপ্ত রূপে সেই ই-কার কিংবা উ-কার বিলুপ্ত হলেও তার আগের অ-কার প্রমিত উচ্চারণে ও-কারান্ত হয়ে থাকে। যেমন :
কলিকাতা থেকে কলকাতা (কোলকাতা)
হরিতকি থেকে হরতকি (হোরতোকি)
সজিনা থেকে সজনে (সোজনে)
ফড়িয়া থেকে ফড়ে (ফোড়ে)
বাড়িয়া থেকে বড়ে (বোড়ে)
ধরিয়া থেকে ধরে (ধোরে)
মরিয়া থেকে মরে (মোরে)
সরিয়া থেকে সরে (সোরে)
ধসিয়া থেকে ধসে (ধোসে)
পচিয়া থেকে পচে (পোচে)
গলিয়া থেকে গলে (গোলে)
পড়িয়া থেকে পড়ে (পোড়ে)
করিয়া থেকে করে (কোরে)
বসিয়া থেকে বসে (বোসে)
করিবে থেকে করবে (র্কোবে)
চলিবে থেকে চলবে (চোল্বে)
মরিবার থেকে মরবার (মোরবার)
ধরিবার থেকে ধরবার (ধোরবার)
একঘরিয়া থেকে একঘরে (এ্যাক্ঘোরে)
হলুদিয়া থেকে হলদে (হোল্দে)

এদিক ওদিক তাকিয়ে সামনে পেয়ে গেলেন জহিরকে। আঙুল তুলে প্রশ্ন করে বসলেন, আগের ক্লাসে আদ্য-অ এর তৃতীয় সূত্র আলোচনা করেছিলাম। জহির, তুমি বলোতো-সূত্রটি। জহির আম্তা আম্তা করে মাথা চুলকে বললো, চলিত ভাষার সংক্ষিপ্ত রূপে ই-কার বিলুপ্ত হলেও আগের অ-কার ও-কারান্ত হয়। দাড়ি গোঁফের ফাঁক গলিয়ে হাসি ফুটে উঠলো। চেয়ারে বসে চোখ বুজে জাবর-কাটার ভঙ্গিতে বলতে শুরু করলেন, কিন্তু সব জায়গাতে এই নিয়ম খাটবে না। এর ব্যতিক্রমও আছে। যেমন :
রইবে থেকে রোবে নয়, রবে
লইবে থেকে লোবে নয়, লবে
সইবে থেকে সোবে নয়, সবে
বইবে থেকে বোবে নয়, ববে
কইবে থেকে কোবে নয়, কবে
হইবে থেকে হোবে নয়, হবে।
কাকলি বললো, স্যার, এগুলো ছাড়া আর কোথাও ব্যতিক্রম ঘটবে না? চোখ মেলে তাকিয়ে স্থির দৃষ্টিতে বললেন, আরো কিছু থাকতেও পারে। তোমরা একটু খোঁজ করে দেখে নিও। সে যাকগে, এবারে নতুন নিয়ম বা সূত্রে প্রবেশ করছি।

আদ্য অ-এর চতুর্থ সূত্র : ১৯৩৬ সালে কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বানান সংস্কার সমিতির এক নম্বর নিয়মে বলা হলো, রেফ এর পর ব্যঞ্জনে কোন দ্বিত্ব হবে না। সুতরাং য-রেফ এর পর য-ফলা উঠে গেল। যেমন :
পর্য্যন্ত হয়ে গেল পর্যন্ত
কার্য্যালয় হয়ে গেল কার্যালয়
সূর্য্য হয়ে গেল সূর্য
বানান সংস্কার করা হলেও, উচ্চারণে কোন পরিবর্তন আনা হলো না। ফলে পূর্বের উচ্চারণটি অবিকৃত থেকেই গেল। কয়েকটি উদাহরণ দিলেই কিন্তু ব্যাপারটি তোমাদের কাছে পরিষ্কার হয়ে যাবে।
মূল বানান বর্তমান বানান উচ্চারণ
পর্য্যন্ত পর্যন্ত পোরজোনতো
পর্য্যায় পর্যায় পোরজায়
পর্য্যটন পর্যটন পোরজোটোন
পর্য্যালোচনা পর্যালোচনা পোরজালোচনা
পর্য্যবেক্ষণ পর্যবেক্ষণ পোরজোবেক্খোন 
মর্য্যাদা মর্যাদা মোরজাদা
চর্য্যাপদ চর্যাপদ চোরজাপদ

পায়চারী করতে করতে গলা চড়িয়ে দিলেন। এবারে আদ্য-অ এর পঞ্চম সূত্র সম্পর্কে বলবো। যদিও এটিকে ঠিক সূত্র বলা যাবে না, তবুও আমরা একটু নিয়মে ফেলে সমস্যার সমাধান করার চেষ্টা করবো।

আদ্য অ-এর পঞ্চম সূত্র : একাক্ষর বা এক অক্ষর বিশিষ্ট শব্দের শেষে যদি ‘ন’ থাকে, তাহলে সাধারণত পূর্বের অ-এর উচ্চারণ ও-কারান্ত হয়।
যেমন : মন (মোন), বন (বোন), জন (জোন) তবে বাংলাদেশে ধন উচ্চারণের ক্ষেত্রে ধোন্ না বলে ধন্ (অ-অবিকৃত) বলা হয় এবং জন এর ক্ষেত্রেও জোন না বলে জন্ (অ-অবিকৃত) বলা হয়ে থাকে। আবার যদি একাক্ষর শব্দের শেষে ন-এর পরিবর্তে ণ থাকে, তাহলে পূর্বের অ-টিকে অবিকৃত রেখে অ-কারান্ত উচ্চারণ করা হয়। যেমন- পণ, মণ, রণ, ক্ষণ ইত্যাদি।
একটানা পায়চারী করতে করতে কথাগুলি বলে হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়লেন স্যার। ডানগালের ভিতর পুরে রাখা ডাবল পানে জোরে জোরে কামড় দিতেই মুচমুচ শব্দের সাথে ঠোঁট রাঙা হয়ে উঠলো।
পানের রসে ভিজে থাকা গোঁফের অগ্রভাগ ডানহাতের উল্টোপিঠে মুছে নিলেন ধীরে ধীরে। চলতে চলতে আবার বলতে লাগলেন, এই একাক্ষরবিশিষ্ট শব্দগুলি যখন অন্য শব্দের সঙ্গে সন্ধির সূত্রে আবদ্ধ হয় কিংবা অন্য পদের সঙ্গে মিলিত হয়ে সমাসবদ্ধ হয়, তখন কিন্তু তার আসল উচ্চারণ অর্থাৎ অ-কারান্ত উচ্চারণের রূপেই ফিরে আসে। 
যেমন- 
মনান্তর-মনান্তর
মনোহর-মনোহর
মনোলোভা-মনোলোভা
মনোতোষিনী-মনোতোষিনি
মনোবিজ্ঞান-মনোবিগ্গাঁন
বনবাসী-বনোবাসি
বনমালী-বনোমালি
বনান্তর-বনান্তর
বনস্পতি-বনোশ্পোতি
ধনপতি-ধনোপোতি
ধনোহারী-ধনোহারি
ধনধান্য-ধনোধান্নো

আমাদের আদ্য-অ এর সূত্রের আলোচনা এখানেই শেষ হলো। তবে এই সূত্র বা নিয়মকে একমাত্র নিয়ম বা চিরাচরিত নিয়ম মনে করা উচিত নয়। কারণ মানুষের মুখের ভাষা বহমান, তা অনেক সময় পরিবর্তন হয় বলেই উচ্চারণের অনেক বিধিই পরিবর্তন হয়ে যায়। ব্যাকরণ আলোচনা, ধ্বনিতত্ত্ব আলোচনা বা ভাষাতাত্ত্বিক বিধান যতই দেয়া হোক না কেন, মানুষের মুখের ভাষার বহমানতাই হচ্ছে এর মূল নিয়ন্ত্রক।
(চলবে)

বুধবার, ১২ অক্টোবর, ২০১১

শুদ্ধ উচ্চারণ বিষয়ক বক্তৃতা : আদ্য ‘অ’ এর সূত্র - অধ্যাপক নরেন বিশ্বাস


পর্ব : ২

মানুষের মুখের ভাষা হচ্ছে জীবন্ত ও বহমান। আজকের মুখের ভাষার সঙ্গে শতবর্ষ পরের ভাষার কিছু পার্থক্য ঘটে যেতে পারে। সেজন্য আজকে আমি তোমাদের যে সূত্রের আলোচনা করবো তা একেবারে চরম সিদ্ধান্ত বলে ধরে নেয়া যাবে না। কারণ আজকের কোন সূত্র ভবিষ্যতে পরিবর্তন করার প্রশ্ন উঠতে পারে। তবে কিভাবে শব্দগুলোকে উচ্চারণ করলে প্রমিত উচ্চারণ পাওয়া যায় অথবা কোন ধারা অবলম্বন করলে ভুলের থেকে অব্যাহতি পাওয়া যায় সে সম্পর্কে একটি সুনির্দিষ্টি বিধি বা সাধারণ সূত্র নিয়ে আমার আজকের আলোচনা। তবে সূত্রগুলোকে কেবল মাথাতে বা খাতাতে লিখে রাখলে চলবে না। প্রতিদিনের কথাতে অনুশীলন করতে হবে। না হলে শুধু ব্যথাই বহন করতে হবে তোমাদের।
বাঙলা স্বরবর্ণের প্রথম বর্ণ হচ্ছে অ। এই অ কোথাও অবিকল অ-এর মতো, আবার কোথাও ও-এর মতো উচ্চারিত হয়ে প্রবল সমস্যার সৃষ্টি করে। অ-এর উচ্চারণের সমস্যার একটি সরল সমাধান করা গেলে বাংলা উচ্চারণের চল্লিশ ভাগ সমস্যার সমাধান আপনাতেই সম্ভব হয়। এখন এই অ-এর সূত্র কি সকল ক্ষেত্রে একরকম হবে?
আমরা মুখ চাওয়া চাওয়া করছি। স্যার ঠিক কি বলতে চান, তা বুঝতে পারছি না। আমাদের ভ্যাবাচ্যাকা ভাব লক্ষ্য করে গমগমে গলায় হাসতে হাসতে বললেন, অমন চুপচাপ না থেকে টুপটাপ করে উত্তর যদি না দাও, তাহলে বুঝবো যে, তোমাদের উৎসাহে দুদিনেই ভাটা পড়বে। আর তাতে একে একে ঝুপঝাপ ঝরে পড়বে উচ্চারণের ক্লাস থেকে। ঝন্টু প্রবল প্রতিবাদ করলো, না, স্যার, আমাদের খুব ভালো লাগছে। একজনও ঝরে পড়বে না, আমরা আপনাকে এই প্রতিশ্রুতি দিতে পারি। স্যার বোধ হয় এই কথাগুলি শুনতে চাচ্ছিলেন। বললেন, সে যাকগে, অ-এর সূত্র সবক্ষেত্রে একরকম হবে না। ‘অমন সহজ সরল’ এই বাক্যটিতে তিনটি শব্দ আছে। প্রতিটি শব্দের প্রথম বর্ণ বলার সময় অ-কারান্ত, দ্বিতীয় বর্ণের সময় ও কারান্ত আর তৃতীয় বর্ণ বলার সময় হসন্ত বলা হচ্ছে অমোন্ সহোজ্ সরোল্। কিন্তু বানানের ক্ষেত্রে দেখা যায় প্রত্যেকটি বর্ণ অ-কারান্ত। অ-ম-ন/স-হ-জ/স-র-ল। প্রথম বর্ণ অর্থাৎ আদিতে একরকম নিয়ম, দ্বিতীয় বর্ণ অর্থাৎ মধ্যে অন্য রকম নিয়ম এবং তৃতীয় অর্থাৎ অন্তে আর একরকম নিয়ম। তাহলে তোমরা দেখতে পাচ্ছো, অ-এর সূত্র হবে তিনরকম। আদ্য অ-এর সূত্র, মধ্য অ-এর সূত্র এবং অন্ত অ-এর সূত্র।
প্রথমে তোমাদের আমি আদ্য অ-এর সূত্র লিখে দিচ্ছি। তোমরা এটা লিখে নাও।
আদ্য অ-এর প্রথম সূত্র : 
শব্দের প্রথমে যদি অ-থাকে (স্বাধীন কিংবা ব্যঞ্জনে যুক্ত), তারপরে ই-কার (হ্রস্ব কিংবা দীর্ঘ) উ-কার (হ্রস্ব কিংবা দীর্ঘ), ঋ-কার, ক্ষ, য-ফলা এবং জ্ঞ থাকে তাহলে তার আগের অ-কার সাধারণত ও-কার রূপে উচ্চারিত হয়।
অংকের যেমন একটি ফর্মুলা দেওয়া থাকে এবং সেই ফর্মুলাতে ফেলে অংক করা সুবিধাজনক হয়ে উঠে। আমরা তেমনি ফর্মুলার মত প্রতীক দিতে চেষ্টা করবো যাতে তোমরা ওই প্রতীকী ঘটনা লক্ষ্য করে একই সূত্রে ফেলে সঠিক উচ্চারণ নির্দেশ করতে পারো।
প্রতীক-১) অ+ই=ও (অর্থাৎ ই-কারের প্রভাবে অ-কারটি ও-এর মতো উচ্চারিত হয়)যেমন : অই (ওই), সই (সোই), খই (খোই), দই (দোই), হৈ হৈ (হোই হোই), রৈ রৈ (রোই, রোই), কড়ি (কোড়ি), মতি (মোতি), গতি (গোতি), রতি (রোতি), পতি (পোতি), অতি (ওতি), অহি (ওহি), ছবি (ছোবি), রবি (রোবি), পলি (পোলি), অস্থি (ওস্থি), কবিতা (কোবিতা), সবিতা (সোবিতা), কলিকাতা (কোলিকাতা), অধিক (ওধিক), অগ্নি (ওগ্নি), অর্চিত (র্ওচিতো), অছিলা (ওছিলা), জরিমা (জোরিমা), তনিমা (তোনিমা), অভিনয় (ওভিনয়্), অভিজাত (ওভিজাত্) ইত্যাদি।
প্রতীক-২) অ+ঈ = ও (অর্থাৎ ঈ-কারের প্রভাবে অ-কারটি ও এর মতো উচ্চারিত হয়) যেমন : নঈ (নোই), নদী (নোদি), সতী (সোতি), গভীর (গোভির), শরীর (শোরির), অতীত (ওতিত্), অধীন্ (ওধিন্), মণীষা (মোনিশা), রসবতী (রসোবোতি), গম্ভীর (গোর্ম্ভি), অভীপ্সা (ওভিপ্সা), অহীন্দ্র (ওহিন্দ্রো), পত্নী (পোত্নি) ইত্যাদি।
প্রতীক-৩) অ+উ = ও (অর্থাৎ উ-কারের প্রভাবে অ-কারটি ও-এর মতো উচ্চারিত হয়) যেমন : বউ (বোউ), মউ (মোউ), তবু (তোবু), কভু (কোভু), তরু (তোরু), বকুল (বোকুল), কবুল (কোবুল), অধুনা (ওধুনা), অযুত (ওজুত্), মধুর (মোর্ধু), কবুতর (কোবুর্ত), অনুভব (ওনুভব্), অনুমান (ওনুমান্), অনুশীলন (ওনুশিলন্), অনুকম্পা (ওনুকম্পা), অনুকরণ (ওনুকরন্) ইত্যাদি। 
প্রতীক-৪) অ+ঊ = ও (অর্থাৎ ঊ-কারের প্রভাবে অ-কারটি ও-এর মতো উচ্চারিত হয়) যেমন : বধূ (বোধু), ময়ূর (মোয়ুর), কটূক্তি (কোটুক্তি), করুন (কোরুন), মরূদ্যান (মোরুদ্দান), কর্পূর (র্কোর্পু), মসূর (মোশুর), অনূদিত (ওনুদিতো) ইত্যাদি।
প্রতীক-৫) অ+ঋ-কার = ও (অর্থাৎ ঋ-কারের প্রভাবে অ-কারটি ও-এর মতো উচ্চারিত হয়) যেমন : বক্তৃতা (বোক্তৃতা), যকৃত (জোকৃত্), কর্তৃত্ব (কোরতৃত্তো), কর্তৃপক্ষ (কোরতৃপখ্খো), কর্তৃকারক (র্কোতৃকারোক), ভতৃহরি (র্ভোতৃহরি), ভতৃহীনা (র্ভোতৃহিনা), মসৃণ (মোসৃন্) ইত্যাদি। 
প্রতীক-৬) অ+ক্ষ-কার = ও (অর্থাৎ ক্ষ-এর প্রভাবে অ-কারটি ও-এর মতো উচ্চারিত হয়) যেমন : লক্ষ (লোক্খো), কক্ষ (কোক্খো) দক্ষ (দোক্খো), পক্ষ (পোক্খো), রক্ষ (রোক্খো), যক্ষ (যোক্খো), অক্ষাংশ (ওক্খাংশ), অক্ষরেখা (ওক্খোরেখা), লক্ষণ (লোক্খোন), ভক্ষণ (ভোক্খোন), তক্ষক (তোক্খোক) ইত্যাদি।
প্রতীক-৭) অ+য-ফলা = ও (অর্থাৎ য-ফলার প্রভাবে অ-কারটি ও-এর মতো উচ্চারিত হয়) যেমন : অন্য (ওন্নো), জন্য (জোন্নো), ধন্য (ধোন্নো), গণ্য (গোন্নো), পণ্য (পোননো), নব্য (নোব্বো), সভ্য (শোভ্ভো), সত্য (সোত্তো), বন্য (বোন্নো), বন্যা (বোন্না), কন্যা (কোন্না), কল্যাণ (কোল্ল্যান), গব্যঘৃত (গোব্বোঘৃতো), তথ্য (তোত্থো), পথ্য (পোত্থো), অত্যন্ত (ওত্তোনতো) অধ্যক্ষ (ওদ্ধোক্খো), অত্যাচারিত (ওত্তাচারিতো) ইত্যাদি।
প্রতীক-৮) অ+জ্ঞ = ও (অর্থাৎ জ্ঞ প্রভাবে অ-কারটি ও-এর মতো উচ্চারিত হয়)যেমন : যজ্ঞ (যোগ্গো)
দেয়াল ঘেঁষা চেয়ারের উপর রাখা ব্ল্যাকবোর্ডে সূত্রের প্রতীক লিখে মুখে মুখে রসালো ভঙ্গিতে উদাহরণ দিয়ে যাচ্ছিলেন স্যার। 
দ্বিতীয় দফা চা পর্ব সারতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন স্যার। বোঝা গেল সূত্রের সরস আলোচনায় ক্ষ্যান্ত দিলেন আজ। তবে স্যারের এই ব্যাপারটি আমাদের মন কেড়েছে। সকলের সামনে নির্দ্বিধায় চা-পান পর্ব চালিয়ে যান নিরবে। স্তব্ধ ক্লাসের সকলে সে দৃশ্য উপভোগ করতে করতে ভাবি- সূত্রালোচনা না তাঁর খাওয়াপর্ব কোনটি শিল্প হয়ে উঠেছে? নাকি দুটোই।

ব্যতিক্রমও আছে (আদ্য অ)
পরের ক্লাসে কোন ভূমিকা না করে জিজ্ঞেস করলেন, অ-এর যে সূত্র দিয়েছিলাম, তা কি তোমরা আত্মস্থ করতে পেরেছো? সমস্বরে বলে উঠলাম, হ্যাঁ স্যার। আবার বললেন, শুধু ‘হ্যাঁ স্যার’ বললে চলবে না। চলনে বলনে ব্যবহার করতে হবে। যদি না লাগাও কাজে, তবে শ্রমও হবে বাজে, আর তোমরাও পড়বে লাজে। দাড়ি গোঁফের ফাঁক গলিয়ে বেরিয়ে এলো উদার হাসি। সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়তেই উদাত্ত কণ্ঠে শুরু করলেন, সেদিন সূত্রের আলোচনার সময় নিয়মের বেলায় ‘সাধারণত’ শব্দটি বলেছিলাম। কিন্তু কিছু অসাধারণ জায়গা আছে, যেখানে সূত্রমতে উচ্চারিত হয় না। এজন্য ব্যতিক্রমও জানতে হয়। নাহলে অনেক সময় বিভ্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিবে। এবার সূত্রের ব্যতিক্রম সম্বন্ধে আলোচনা করবো।
ব্যতিক্রম-ক : শব্দের প্রথমে যদি না-বোধক বা নেতিবাচক ‘অ’ কিংবা ‘অন’ কিংবা সহিতর্থে ‘স’ থাকে তাহলে কোন অবস্থাতেই সেই ‘অ’ কিংবা ‘স’ ও-কারান্ত উচ্চারিত হবে না। এখানে ‘কোন অবস্থাতেই’ বলতে বোঝানো হচ্ছে, অ, অন, কিংবা স এর পর ই-কার, উ-কার, ক্ষ, জ্ঞ যাই আসুক না কেন ‘অ’ অবিকৃত থাকবে।
যেমন : অবিকৃত (অবিকৃতো), অবিচার (অবির্চা), অস্থির (অস্থির), অবিরাম (অবিরাম্), অবিনাশী (অবিনাশি), অনিয়ম (অনিয়ম্), অনিশ্চিত (অনিশ্চিতো), অসীম (অশিম্), অতুল (অতুল্), অনুপম (অনুপম্), অনুপস্থিত (অনুপোস্থিত), অমূল্য (অমুল্লো), অদৃষ্ট (অদৃশ্টো), অতৃপ্ত (অতৃপ্তো), অন্যায় (অন্ন্যায়), অব্যয় (অব্বয়), অটুট (অটুট্), অক্ষম (অক্খম্), অক্ষয় (অক্খয়্), অজ্ঞ (অগ্গোঁ), অজ্ঞান (অগ্গ্যাঁন), সঠিক (সঠিক্), সচিত্র (সচিত্ত্রো), সবিনয় (সবিনয়্), সসীম (শশীম্), সস্ত্রীক (শস্ত্রিক্), সতীর্থ (শতিরথো)।
এই পর্যন্ত ব্লাকবোর্ডে লিখে মুখে মুখে বলে গেলেন আবার। চেয়ারে বসে ধীরে সুস্থে সামনের দিকে তাকিয়ে বললেন, এতক্ষণ যা বললাম, তা যদি তোমরা হৃদয়ঙ্গম করতে পারো, তাহলে আমি পরবর্তী ব্যতিক্রমের দিকে এগিয়ে যেতে পারি। লীনা বসেছিল চুপ করে। অনেকটা ফস্ করে বলে ফেললো, স্যার, না-বোধক ‘অ’ যদি অবিকৃত থাকে, তাহলে অতুল প্রসাদের গানকে; ওতুল প্রসাদের গান বলা হয় কেন? শব্দময় আকর্ণ বিস্তৃত হাসি ছড়িয়ে পড়লো সারা ঘরে। কিছু না বুঝে আমরাও হেসে উঠলাম জোরে। স্যার বলতে শুরু করলেন, তোমাদের যে ব্যতিক্রমটির কথা বলতে চেয়েছিলাম, ওই মেয়েটি সে কথাই পেড়ে বসলো। সে যাকগে, এবার তোমরা চলো পরবর্তী ব্যতিক্রমে।
ব্যতিক্রম-খ : যেখানে কারো নাম বোঝায় সেখানে না-বোধক ‘অ’ কোথাও কোথাও ও-কারান্ত হতে পারে। যেমন ক্লাসের ওই সুদর্শনা মেয়েটি জিজ্ঞেস করেছে ওতুল প্রসাদের গান বলা হয় কেন? এখানে অতুলের স্থলে ওতুল বলা হচ্ছে যেহেতু ওটি একটি নাম। আমাদের দেশের সঙ্গীত শিল্পী ওজিত রায় (অজিত) কিংবা কবি ওসীম (অসীম) সাহার নাম নিশ্চয়ই শুনেছো। অথবা ওবিনাশ (অবিনাশ) দত্ত কিংবা ওনুপম (অনুপম) সেন নামে কাউকে ডাকতে শুনেছো। তবে নামের ক্ষেত্রে অ-যদিও ও-এর দিকে ঝুঁকে যায়, তবু অ-কারান্ত হলে ভালো হয়, তাতে নামের দিক থেকে অর্থগত অসুবিধা হয় না।
ব্যতিক্রম-গ : ইতোপূর্বে আমরা জেনেছি ক্ষ-থাকলে, তার আগের ‘অ’ ও-কারান্ত হয়। যেমন : রোগের লক্ষণ (লোক্খোন্) কিন্তু ক্ষ তে যদি ম-ফলা থাকে, তবে আগের ‘অ’ কোথাও অ-কারান্ত উচ্চারিত হয়। যেমন রামের ভাই লক্ষ্মণ (লক্খোঁন) একইভাবে পক্ষ্ম (পক্খোঁ), যক্ষ্মা (যক্খাঁ)।
অভ্যাসবশত বক্তৃতার সময় স্যার পায়চারী করেন। বক্তৃতার মাঝে মাঝে সাময়িক বিরতিকালে বা প্রসঙ্গান্তরে যাওয়ার সময় চেয়ারে বসে একটু বিশ্রাম নেন। কিন্তু কথা সে সময় থেমে থাকে না। বসে বসেই বলতে শুরু করলেন, এতক্ষণ আমরা সূত্র এবং ব্যতিক্রম আলোচনার মাধ্যমে অ-এর প্রথম বিধি অতিক্রম করলাম মাত্র। এরপর আমরা দ্বিতীয় বিধিতে যাব। আশা করি, প্রথম বিধির তুলনায় দ্বিতীয় বিধি সহজ মনে হবে তোমাদের কাছে।
(চলবে)