পর্ব : চার এবার মধ্য - অ এর সূত্রাবলী অনেকদিন পর স্যারকে আজ বেশ ফ্রেশ দেখাচ্ছে। চুল-দাড়ি ছোট করে ছেঁটে পাঞ্জাবীর বদলে হাফ শার্ট পরে ফিটফাট হয়ে এসেছেন। কাঁধের ঝোলাটিও উধাও। তবে পায়ের স্যাণ্ডেল আগেরটিই আছে।গাম্ভীর্য ভেদ করে দাঁড়িয়ে পড়লেন। কোমল হাসি সারা মুখমণ্ডলে। চেয়ারে বসে থেকেই বলতে শুরু করলেন, আদ্য-অ-এর পর আজ আলোচনা করবো মধ্য-অ- এর সূত্র। নড়েচড়ে বসলাম। উচ্চারণ সম্পর্কে যে ভীতি ছিল, তা কেটে গেছে কবে। এখন উচ্চারণের সূত্র শুনতে শুনতে মজার নেশায় পেয়ে বসেছে যেন। আদ্য-অ-এর নিয়মকানুন ঠোঁটের আগে ঝুলে থাকছে সবসময়। একজন আরেকজনকে উচ্চারণ দিয়ে ঠকানোর খেলা জমে উঠেছে এই ক’দিনে। স্যার গলা চড়ালেন আরো একটু। এখন যেটি আলোচনা করবো, তাকে তোমরা মূল সূত্র না বলে প্রাসঙ্গিক সূত্র বলতে পারো। এই সূত্রটি হলো : যে সকল কারণে শব্দের আদ্য-অ, ও-কারন্ত উচ্চারিত হয়, তার সবগুলি সূত্রই মধ্য-অ এর ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রযোজ্য। যেমন- ই-কার আদ্য-অ-এর ক্ষেত্রে মতি (মোতি) মধ্য-অ-এর ক্ষেত্রে সুমতি (সুমোতি) দুর্মতি (র্দুমোতি) অগতি (অগোতি) প্রগতি (প্রোগোতি) কুমতি (কুমোতি) উ-কার/ঊ-কার/ঋ-কার আদ্য-অ-এর ক্ষেত্রে তনু (তোনু) ময়ুর (মোয়ুর) মধ্য-অ-এর ক্ষেত্রে সুতনু (সুতোনু) সুমধু (সুমোধু) পথতরু (পথোতোরু) পুত্রবধু (পুত্ত্রোবোধু) মনময়ুর (মনমোয়ুর) সুমসৃন (সুমোস্সৃন) অমসৃন (অমোস্সৃন) ঈ-কার আদ্য-অ-এর ক্ষেত্রে ননী (নোনি) মধ্য-অ-এর ক্ষেত্রে জননী (জনোনি) ধরনী (ধরোনি) সরণী (সরোনি) বরনী (বরোনি) ঘরনী (ঘরোনি) য-ফলা বিলুপ্ত আদ্য-অ-এর ক্ষেত্রে পর্যায় (র্পোযায়) মধ্য-অ-এর ক্ষেত্রে আশ্চর্য (আশ্চোরযো) ঐশ্বর্য (ঐর্শোযো) সৌন্দর্য (সৌর্ন্দোযো) সুমি চুপচাপ বসে স্যারের বক্তৃতা শুনতে অভ্যস্ত। কোনদিন একটি কথাও বলে না। সেজন্য কারও নজরে পড়েনি সে। আমরাও তাকে খুব একটা খেয়াল করিনি কোনদিন। আজ দুম্ করে প্রশ্ন করলো, স্যার, আদ্য-অ-এর সূত্র অনুযায়ী মধ্য-অ তেও একই নিয়ম প্রযোজ্য হলে আলাদাভাবে আলোচনা করার আর দরকার কি? বললেই হতো, আদ্য, মধ্য এবং অন্ত সকল অ-এর ক্ষেত্রে একই নিয়ম প্রযোজ্য। আলাদা আর কোন সূত্র নেই। স্যার একটু থমকে গেলেন। পর মুহূর্তেই খুব স্বাভাবিক কণ্ঠে বললেন, এই মেয়ে, বোকার মতো কথা বলোনাতো! তোমাকে কে বলেছে, মধ্য-অ-এর ক্ষেত্রে কোন মৌলিক সূত্র নেই? এর পরইতো সেই আলোচনায় আসব। সুমি এদিক ওদিক তাকিয়ে চুপ্সে গেল একটু। কোন কথা না বলে হাবার মতো চুপচাপ তাকিয়ে থাকলো স্যারের দিকে। একটু মায়ামাখা সুরে স্যার বললেন, সে যাকগ্, এবার আমরা মধ্য-অ-এর মৌলিক সূত্র আলোচনা করবো। সূত্র : এক তিনবর্ণে গঠিত শব্দের প্রথম বর্ণটি যদি অ-কারান্ত, আ-কারান্ত, এ-কারান্ত কিংবা ও-কারান্ত হয়, তাহলে মাঝখানের অ-কারান্ত বর্ণটি সাধারণত ও-কারান্ত উচ্চারিত হয়। এখানে লক্ষ্যণীয় যে, শর্ত চারটি হলো : অ-কারান্ত, আ-কারান্ত, এ-কারান্ত, ও-কারান্ত। আদ্য বর্ণ অ-কারান্ত অমন (অমোন্) গঠন (গঠোন্) যখন (যখোন্) তখন (তখোন্) পঠন (পঠোন্) ফসল (ফসোল্) ফলন (ফলোন্) কলম (কলোম্) মশক (মশোক্) দলন (দলোন্) মলন (মলোন্) শতক (শতোক্) যতন (যতোন্) রতন (রতোন্) আদ্য বর্ণ আ-কারান্ত আমন (আমোন্) কাজল (কাজোল্) আসল (আসোল্) কাগজ (কাগোজ্) পাগল (পাগোল্) ছাগল (ছাগোল্) জাগর (জার্গো) নাগর (নার্গো) সাগর (সার্গো) আসন (আসোন্) বাসন (বাসোন্) আদ্য বর্ণ এ-কারান্ত চেতন (চেতোন্) বেতন (বেতোন্) কেতন (কেতোন্) লেহন (লেহোন্) শেখর (শের্খ) কেশর (কের্শো) আদ্য বর্ণ ও-কারান্ত ওজন (ওজোন্) ভোজন (ভোজোন্) শোধন (শোধোন্) বোধন (বোধোন্) তোষণ (তোষোন্) লোচন (লোচোন্) রোচন (রোচোন্) দীপু বরাবরই বুদ্ধিদীপ্ত প্রশ্ন করে, আজকেও সুযোগ নিল। ধীরে সুস্থে উঠে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করলো, স্যার, এই নিয়মগুলো কি সবক্ষেত্রেই প্রযোজ্য, নাকি কোন ব্যতিক্রমও আছে? চোখ বন্ধ করে পান চিবোতে শুরু করেছিলেন স্যার। যেন ঘুম থেকে উঠলেন, এমনভাবে চোখ মেলে চাইলেন দীপুর দিকে। পান চিবোতে চিবোতে বলতে লাগলেন, হ্যাঁ, হ্যাঁ দীপু ঠিক সময়ে প্রশ্নটি করে আমাকে বাঁচিয়েছে। ব্যতিক্রম অবশ্যই আছে। কোথায় ব্যতিক্রম হয়, সে ব্যাপারটি তোমরা এবার লিখে নাও। তিনবর্ণে গঠিত শব্দের প্রথম বর্ণটি যদি না বোধক অ-হয়, কিংবা সহিত অর্থে স-হয়, তাহলে মাঝখানের অ-কারান্ত বর্ণটি ও-কারান্ত উচ্চারিত না হওয়াই বাঞ্ছনীয়। যেমন : অচল (অচল্) অজর (অর্জ) অমর (অর্ম) অমল (অমল্) অবশ (অবশ্) অবলা (অবলা) সরস্ (সরস্) সরব (সরব্) সফল (সফল্) সজল (সজল্) অটল (অটল্) অচল (অচল্) সুমন ঢুকলো গরম চায়ের গ্লাস হাতে। সেদিকে স্নিগ্ধ দৃষ্টি মেলে তৃপ্তির হাসি দিলেন স্যার ছোট্ট করে। চায়ের গ্লাসে সশব্দে চুমুক দিয়ে উঠে দাঁড়ালেন আবার। গ্লাস হাতে হাঁটতে হাঁটতে মধ্য -অ-এর দ্বিতীয় ও শেষ সূত্র লেখার নির্দেশ দিয়ে বলতে শুরু করলেন। সূত্র : দুই একাধিক সংস্কৃত শব্দ বা তৎসম শব্দ সমাসবদ্ধ পদে পরিণত হলে, পূর্বপদের শেষের অ-কারান্ত বর্ণটি ও-কারান্ত উচ্চারিত হয়। যেমন : পথ (পথ্) থেকে পথচারী (পথোচারি) মেঘ (মেঘ্) থেকে মেঘমালা (মেঘোমালা) জল (জল্) থেকে জলচর (জলোচর) শ্রম (শ্রম্) থেকে শ্রমমন্ত্রী (শ্রমোমোন্ত্রি) বন (বন্) থেকে বনভূমি (বনোভুমি), বনচারী (বনোচারি), বনবাসী (বনোবাসি) লোক (লোক্) থেকে লোকসাহিত্য (লোকোসাহিত্ত্য) গণ (গণ্) থেকে গণব্যবহার (গনোব্যবহার), গণনাট্য (গনোনাট্ট্য), গণনায়ক (গনোনায়ক্) চায়ের গ্লাসটি হাত থেকে চেয়ারের উপরে রেখে পাশের খালি চেয়ারটিতে ধপ্ করে বসে পড়লেন। দীপুর দিকে তাকিয়ে কপাল কুঁচকে রহস্যময় দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বললেন, এবারো কিন্তু ব্যতিক্রম আছে। যেমন : রাজ (রাজ্) থেকে রাজহংস (রাজহংসো), রাজহাঁস (রাজহাঁস), রাজকন্যা (রাজকননা), রাম (রাম্) থেকে রামচন্দ্র (রামচন্দ্রো)
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন