পর্ব : ২
মানুষের মুখের ভাষা হচ্ছে জীবন্ত ও বহমান। আজকের মুখের ভাষার সঙ্গে শতবর্ষ পরের ভাষার কিছু পার্থক্য ঘটে যেতে পারে। সেজন্য আজকে আমি তোমাদের যে সূত্রের আলোচনা করবো তা একেবারে চরম সিদ্ধান্ত বলে ধরে নেয়া যাবে না। কারণ আজকের কোন সূত্র ভবিষ্যতে পরিবর্তন করার প্রশ্ন উঠতে পারে। তবে কিভাবে শব্দগুলোকে উচ্চারণ করলে প্রমিত উচ্চারণ পাওয়া যায় অথবা কোন ধারা অবলম্বন করলে ভুলের থেকে অব্যাহতি পাওয়া যায় সে সম্পর্কে একটি সুনির্দিষ্টি বিধি বা সাধারণ সূত্র নিয়ে আমার আজকের আলোচনা। তবে সূত্রগুলোকে কেবল মাথাতে বা খাতাতে লিখে রাখলে চলবে না। প্রতিদিনের কথাতে অনুশীলন করতে হবে। না হলে শুধু ব্যথাই বহন করতে হবে তোমাদের।
বাঙলা স্বরবর্ণের প্রথম বর্ণ হচ্ছে অ। এই অ কোথাও অবিকল অ-এর মতো, আবার কোথাও ও-এর মতো উচ্চারিত হয়ে প্রবল সমস্যার সৃষ্টি করে। অ-এর উচ্চারণের সমস্যার একটি সরল সমাধান করা গেলে বাংলা উচ্চারণের চল্লিশ ভাগ সমস্যার সমাধান আপনাতেই সম্ভব হয়। এখন এই অ-এর সূত্র কি সকল ক্ষেত্রে একরকম হবে?
আমরা মুখ চাওয়া চাওয়া করছি। স্যার ঠিক কি বলতে চান, তা বুঝতে পারছি না। আমাদের ভ্যাবাচ্যাকা ভাব লক্ষ্য করে গমগমে গলায় হাসতে হাসতে বললেন, অমন চুপচাপ না থেকে টুপটাপ করে উত্তর যদি না দাও, তাহলে বুঝবো যে, তোমাদের উৎসাহে দুদিনেই ভাটা পড়বে। আর তাতে একে একে ঝুপঝাপ ঝরে পড়বে উচ্চারণের ক্লাস থেকে। ঝন্টু প্রবল প্রতিবাদ করলো, না, স্যার, আমাদের খুব ভালো লাগছে। একজনও ঝরে পড়বে না, আমরা আপনাকে এই প্রতিশ্রুতি দিতে পারি। স্যার বোধ হয় এই কথাগুলি শুনতে চাচ্ছিলেন। বললেন, সে যাকগে, অ-এর সূত্র সবক্ষেত্রে একরকম হবে না। ‘অমন সহজ সরল’ এই বাক্যটিতে তিনটি শব্দ আছে। প্রতিটি শব্দের প্রথম বর্ণ বলার সময় অ-কারান্ত, দ্বিতীয় বর্ণের সময় ও কারান্ত আর তৃতীয় বর্ণ বলার সময় হসন্ত বলা হচ্ছে অমোন্ সহোজ্ সরোল্। কিন্তু বানানের ক্ষেত্রে দেখা যায় প্রত্যেকটি বর্ণ অ-কারান্ত। অ-ম-ন/স-হ-জ/স-র-ল। প্রথম বর্ণ অর্থাৎ আদিতে একরকম নিয়ম, দ্বিতীয় বর্ণ অর্থাৎ মধ্যে অন্য রকম নিয়ম এবং তৃতীয় অর্থাৎ অন্তে আর একরকম নিয়ম। তাহলে তোমরা দেখতে পাচ্ছো, অ-এর সূত্র হবে তিনরকম। আদ্য অ-এর সূত্র, মধ্য অ-এর সূত্র এবং অন্ত অ-এর সূত্র।
প্রথমে তোমাদের আমি আদ্য অ-এর সূত্র লিখে দিচ্ছি। তোমরা এটা লিখে নাও।
বাঙলা স্বরবর্ণের প্রথম বর্ণ হচ্ছে অ। এই অ কোথাও অবিকল অ-এর মতো, আবার কোথাও ও-এর মতো উচ্চারিত হয়ে প্রবল সমস্যার সৃষ্টি করে। অ-এর উচ্চারণের সমস্যার একটি সরল সমাধান করা গেলে বাংলা উচ্চারণের চল্লিশ ভাগ সমস্যার সমাধান আপনাতেই সম্ভব হয়। এখন এই অ-এর সূত্র কি সকল ক্ষেত্রে একরকম হবে?
আমরা মুখ চাওয়া চাওয়া করছি। স্যার ঠিক কি বলতে চান, তা বুঝতে পারছি না। আমাদের ভ্যাবাচ্যাকা ভাব লক্ষ্য করে গমগমে গলায় হাসতে হাসতে বললেন, অমন চুপচাপ না থেকে টুপটাপ করে উত্তর যদি না দাও, তাহলে বুঝবো যে, তোমাদের উৎসাহে দুদিনেই ভাটা পড়বে। আর তাতে একে একে ঝুপঝাপ ঝরে পড়বে উচ্চারণের ক্লাস থেকে। ঝন্টু প্রবল প্রতিবাদ করলো, না, স্যার, আমাদের খুব ভালো লাগছে। একজনও ঝরে পড়বে না, আমরা আপনাকে এই প্রতিশ্রুতি দিতে পারি। স্যার বোধ হয় এই কথাগুলি শুনতে চাচ্ছিলেন। বললেন, সে যাকগে, অ-এর সূত্র সবক্ষেত্রে একরকম হবে না। ‘অমন সহজ সরল’ এই বাক্যটিতে তিনটি শব্দ আছে। প্রতিটি শব্দের প্রথম বর্ণ বলার সময় অ-কারান্ত, দ্বিতীয় বর্ণের সময় ও কারান্ত আর তৃতীয় বর্ণ বলার সময় হসন্ত বলা হচ্ছে অমোন্ সহোজ্ সরোল্। কিন্তু বানানের ক্ষেত্রে দেখা যায় প্রত্যেকটি বর্ণ অ-কারান্ত। অ-ম-ন/স-হ-জ/স-র-ল। প্রথম বর্ণ অর্থাৎ আদিতে একরকম নিয়ম, দ্বিতীয় বর্ণ অর্থাৎ মধ্যে অন্য রকম নিয়ম এবং তৃতীয় অর্থাৎ অন্তে আর একরকম নিয়ম। তাহলে তোমরা দেখতে পাচ্ছো, অ-এর সূত্র হবে তিনরকম। আদ্য অ-এর সূত্র, মধ্য অ-এর সূত্র এবং অন্ত অ-এর সূত্র।
প্রথমে তোমাদের আমি আদ্য অ-এর সূত্র লিখে দিচ্ছি। তোমরা এটা লিখে নাও।
আদ্য অ-এর প্রথম সূত্র :
শব্দের প্রথমে যদি অ-থাকে (স্বাধীন কিংবা ব্যঞ্জনে যুক্ত), তারপরে ই-কার (হ্রস্ব কিংবা দীর্ঘ) উ-কার (হ্রস্ব কিংবা দীর্ঘ), ঋ-কার, ক্ষ, য-ফলা এবং জ্ঞ থাকে তাহলে তার আগের অ-কার সাধারণত ও-কার রূপে উচ্চারিত হয়।
অংকের যেমন একটি ফর্মুলা দেওয়া থাকে এবং সেই ফর্মুলাতে ফেলে অংক করা সুবিধাজনক হয়ে উঠে। আমরা তেমনি ফর্মুলার মত প্রতীক দিতে চেষ্টা করবো যাতে তোমরা ওই প্রতীকী ঘটনা লক্ষ্য করে একই সূত্রে ফেলে সঠিক উচ্চারণ নির্দেশ করতে পারো।
প্রতীক-১) অ+ই=ও (অর্থাৎ ই-কারের প্রভাবে অ-কারটি ও-এর মতো উচ্চারিত হয়)যেমন : অই (ওই), সই (সোই), খই (খোই), দই (দোই), হৈ হৈ (হোই হোই), রৈ রৈ (রোই, রোই), কড়ি (কোড়ি), মতি (মোতি), গতি (গোতি), রতি (রোতি), পতি (পোতি), অতি (ওতি), অহি (ওহি), ছবি (ছোবি), রবি (রোবি), পলি (পোলি), অস্থি (ওস্থি), কবিতা (কোবিতা), সবিতা (সোবিতা), কলিকাতা (কোলিকাতা), অধিক (ওধিক), অগ্নি (ওগ্নি), অর্চিত (র্ওচিতো), অছিলা (ওছিলা), জরিমা (জোরিমা), তনিমা (তোনিমা), অভিনয় (ওভিনয়্), অভিজাত (ওভিজাত্) ইত্যাদি।
প্রতীক-২) অ+ঈ = ও (অর্থাৎ ঈ-কারের প্রভাবে অ-কারটি ও এর মতো উচ্চারিত হয়) যেমন : নঈ (নোই), নদী (নোদি), সতী (সোতি), গভীর (গোভির), শরীর (শোরির), অতীত (ওতিত্), অধীন্ (ওধিন্), মণীষা (মোনিশা), রসবতী (রসোবোতি), গম্ভীর (গোর্ম্ভি), অভীপ্সা (ওভিপ্সা), অহীন্দ্র (ওহিন্দ্রো), পত্নী (পোত্নি) ইত্যাদি।
প্রতীক-৩) অ+উ = ও (অর্থাৎ উ-কারের প্রভাবে অ-কারটি ও-এর মতো উচ্চারিত হয়) যেমন : বউ (বোউ), মউ (মোউ), তবু (তোবু), কভু (কোভু), তরু (তোরু), বকুল (বোকুল), কবুল (কোবুল), অধুনা (ওধুনা), অযুত (ওজুত্), মধুর (মোর্ধু), কবুতর (কোবুর্ত), অনুভব (ওনুভব্), অনুমান (ওনুমান্), অনুশীলন (ওনুশিলন্), অনুকম্পা (ওনুকম্পা), অনুকরণ (ওনুকরন্) ইত্যাদি।
প্রতীক-৪) অ+ঊ = ও (অর্থাৎ ঊ-কারের প্রভাবে অ-কারটি ও-এর মতো উচ্চারিত হয়) যেমন : বধূ (বোধু), ময়ূর (মোয়ুর), কটূক্তি (কোটুক্তি), করুন (কোরুন), মরূদ্যান (মোরুদ্দান), কর্পূর (র্কোর্পু), মসূর (মোশুর), অনূদিত (ওনুদিতো) ইত্যাদি।
প্রতীক-৫) অ+ঋ-কার = ও (অর্থাৎ ঋ-কারের প্রভাবে অ-কারটি ও-এর মতো উচ্চারিত হয়) যেমন : বক্তৃতা (বোক্তৃতা), যকৃত (জোকৃত্), কর্তৃত্ব (কোরতৃত্তো), কর্তৃপক্ষ (কোরতৃপখ্খো), কর্তৃকারক (র্কোতৃকারোক), ভতৃহরি (র্ভোতৃহরি), ভতৃহীনা (র্ভোতৃহিনা), মসৃণ (মোসৃন্) ইত্যাদি।
প্রতীক-৬) অ+ক্ষ-কার = ও (অর্থাৎ ক্ষ-এর প্রভাবে অ-কারটি ও-এর মতো উচ্চারিত হয়) যেমন : লক্ষ (লোক্খো), কক্ষ (কোক্খো) দক্ষ (দোক্খো), পক্ষ (পোক্খো), রক্ষ (রোক্খো), যক্ষ (যোক্খো), অক্ষাংশ (ওক্খাংশ), অক্ষরেখা (ওক্খোরেখা), লক্ষণ (লোক্খোন), ভক্ষণ (ভোক্খোন), তক্ষক (তোক্খোক) ইত্যাদি।
প্রতীক-৭) অ+য-ফলা = ও (অর্থাৎ য-ফলার প্রভাবে অ-কারটি ও-এর মতো উচ্চারিত হয়) যেমন : অন্য (ওন্নো), জন্য (জোন্নো), ধন্য (ধোন্নো), গণ্য (গোন্নো), পণ্য (পোননো), নব্য (নোব্বো), সভ্য (শোভ্ভো), সত্য (সোত্তো), বন্য (বোন্নো), বন্যা (বোন্না), কন্যা (কোন্না), কল্যাণ (কোল্ল্যান), গব্যঘৃত (গোব্বোঘৃতো), তথ্য (তোত্থো), পথ্য (পোত্থো), অত্যন্ত (ওত্তোনতো) অধ্যক্ষ (ওদ্ধোক্খো), অত্যাচারিত (ওত্তাচারিতো) ইত্যাদি।
প্রতীক-৮) অ+জ্ঞ = ও (অর্থাৎ জ্ঞ প্রভাবে অ-কারটি ও-এর মতো উচ্চারিত হয়)যেমন : যজ্ঞ (যোগ্গো)
দেয়াল ঘেঁষা চেয়ারের উপর রাখা ব্ল্যাকবোর্ডে সূত্রের প্রতীক লিখে মুখে মুখে রসালো ভঙ্গিতে উদাহরণ দিয়ে যাচ্ছিলেন স্যার।
দ্বিতীয় দফা চা পর্ব সারতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন স্যার। বোঝা গেল সূত্রের সরস আলোচনায় ক্ষ্যান্ত দিলেন আজ। তবে স্যারের এই ব্যাপারটি আমাদের মন কেড়েছে। সকলের সামনে নির্দ্বিধায় চা-পান পর্ব চালিয়ে যান নিরবে। স্তব্ধ ক্লাসের সকলে সে দৃশ্য উপভোগ করতে করতে ভাবি- সূত্রালোচনা না তাঁর খাওয়াপর্ব কোনটি শিল্প হয়ে উঠেছে? নাকি দুটোই।
ব্যতিক্রমও আছে (আদ্য অ)
পরের ক্লাসে কোন ভূমিকা না করে জিজ্ঞেস করলেন, অ-এর যে সূত্র দিয়েছিলাম, তা কি তোমরা আত্মস্থ করতে পেরেছো? সমস্বরে বলে উঠলাম, হ্যাঁ স্যার। আবার বললেন, শুধু ‘হ্যাঁ স্যার’ বললে চলবে না। চলনে বলনে ব্যবহার করতে হবে। যদি না লাগাও কাজে, তবে শ্রমও হবে বাজে, আর তোমরাও পড়বে লাজে। দাড়ি গোঁফের ফাঁক গলিয়ে বেরিয়ে এলো উদার হাসি। সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়তেই উদাত্ত কণ্ঠে শুরু করলেন, সেদিন সূত্রের আলোচনার সময় নিয়মের বেলায় ‘সাধারণত’ শব্দটি বলেছিলাম। কিন্তু কিছু অসাধারণ জায়গা আছে, যেখানে সূত্রমতে উচ্চারিত হয় না। এজন্য ব্যতিক্রমও জানতে হয়। নাহলে অনেক সময় বিভ্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিবে। এবার সূত্রের ব্যতিক্রম সম্বন্ধে আলোচনা করবো।
ব্যতিক্রম-ক : শব্দের প্রথমে যদি না-বোধক বা নেতিবাচক ‘অ’ কিংবা ‘অন’ কিংবা সহিতর্থে ‘স’ থাকে তাহলে কোন অবস্থাতেই সেই ‘অ’ কিংবা ‘স’ ও-কারান্ত উচ্চারিত হবে না। এখানে ‘কোন অবস্থাতেই’ বলতে বোঝানো হচ্ছে, অ, অন, কিংবা স এর পর ই-কার, উ-কার, ক্ষ, জ্ঞ যাই আসুক না কেন ‘অ’ অবিকৃত থাকবে।
যেমন : অবিকৃত (অবিকৃতো), অবিচার (অবির্চা), অস্থির (অস্থির), অবিরাম (অবিরাম্), অবিনাশী (অবিনাশি), অনিয়ম (অনিয়ম্), অনিশ্চিত (অনিশ্চিতো), অসীম (অশিম্), অতুল (অতুল্), অনুপম (অনুপম্), অনুপস্থিত (অনুপোস্থিত), অমূল্য (অমুল্লো), অদৃষ্ট (অদৃশ্টো), অতৃপ্ত (অতৃপ্তো), অন্যায় (অন্ন্যায়), অব্যয় (অব্বয়), অটুট (অটুট্), অক্ষম (অক্খম্), অক্ষয় (অক্খয়্), অজ্ঞ (অগ্গোঁ), অজ্ঞান (অগ্গ্যাঁন), সঠিক (সঠিক্), সচিত্র (সচিত্ত্রো), সবিনয় (সবিনয়্), সসীম (শশীম্), সস্ত্রীক (শস্ত্রিক্), সতীর্থ (শতিরথো)।
এই পর্যন্ত ব্লাকবোর্ডে লিখে মুখে মুখে বলে গেলেন আবার। চেয়ারে বসে ধীরে সুস্থে সামনের দিকে তাকিয়ে বললেন, এতক্ষণ যা বললাম, তা যদি তোমরা হৃদয়ঙ্গম করতে পারো, তাহলে আমি পরবর্তী ব্যতিক্রমের দিকে এগিয়ে যেতে পারি। লীনা বসেছিল চুপ করে। অনেকটা ফস্ করে বলে ফেললো, স্যার, না-বোধক ‘অ’ যদি অবিকৃত থাকে, তাহলে অতুল প্রসাদের গানকে; ওতুল প্রসাদের গান বলা হয় কেন? শব্দময় আকর্ণ বিস্তৃত হাসি ছড়িয়ে পড়লো সারা ঘরে। কিছু না বুঝে আমরাও হেসে উঠলাম জোরে। স্যার বলতে শুরু করলেন, তোমাদের যে ব্যতিক্রমটির কথা বলতে চেয়েছিলাম, ওই মেয়েটি সে কথাই পেড়ে বসলো। সে যাকগে, এবার তোমরা চলো পরবর্তী ব্যতিক্রমে।
ব্যতিক্রম-খ : যেখানে কারো নাম বোঝায় সেখানে না-বোধক ‘অ’ কোথাও কোথাও ও-কারান্ত হতে পারে। যেমন ক্লাসের ওই সুদর্শনা মেয়েটি জিজ্ঞেস করেছে ওতুল প্রসাদের গান বলা হয় কেন? এখানে অতুলের স্থলে ওতুল বলা হচ্ছে যেহেতু ওটি একটি নাম। আমাদের দেশের সঙ্গীত শিল্পী ওজিত রায় (অজিত) কিংবা কবি ওসীম (অসীম) সাহার নাম নিশ্চয়ই শুনেছো। অথবা ওবিনাশ (অবিনাশ) দত্ত কিংবা ওনুপম (অনুপম) সেন নামে কাউকে ডাকতে শুনেছো। তবে নামের ক্ষেত্রে অ-যদিও ও-এর দিকে ঝুঁকে যায়, তবু অ-কারান্ত হলে ভালো হয়, তাতে নামের দিক থেকে অর্থগত অসুবিধা হয় না।
ব্যতিক্রম-গ : ইতোপূর্বে আমরা জেনেছি ক্ষ-থাকলে, তার আগের ‘অ’ ও-কারান্ত হয়। যেমন : রোগের লক্ষণ (লোক্খোন্) কিন্তু ক্ষ তে যদি ম-ফলা থাকে, তবে আগের ‘অ’ কোথাও অ-কারান্ত উচ্চারিত হয়। যেমন রামের ভাই লক্ষ্মণ (লক্খোঁন) একইভাবে পক্ষ্ম (পক্খোঁ), যক্ষ্মা (যক্খাঁ)।
অভ্যাসবশত বক্তৃতার সময় স্যার পায়চারী করেন। বক্তৃতার মাঝে মাঝে সাময়িক বিরতিকালে বা প্রসঙ্গান্তরে যাওয়ার সময় চেয়ারে বসে একটু বিশ্রাম নেন। কিন্তু কথা সে সময় থেমে থাকে না। বসে বসেই বলতে শুরু করলেন, এতক্ষণ আমরা সূত্র এবং ব্যতিক্রম আলোচনার মাধ্যমে অ-এর প্রথম বিধি অতিক্রম করলাম মাত্র। এরপর আমরা দ্বিতীয় বিধিতে যাব। আশা করি, প্রথম বিধির তুলনায় দ্বিতীয় বিধি সহজ মনে হবে তোমাদের কাছে।
(চলবে)
শব্দের প্রথমে যদি অ-থাকে (স্বাধীন কিংবা ব্যঞ্জনে যুক্ত), তারপরে ই-কার (হ্রস্ব কিংবা দীর্ঘ) উ-কার (হ্রস্ব কিংবা দীর্ঘ), ঋ-কার, ক্ষ, য-ফলা এবং জ্ঞ থাকে তাহলে তার আগের অ-কার সাধারণত ও-কার রূপে উচ্চারিত হয়।
অংকের যেমন একটি ফর্মুলা দেওয়া থাকে এবং সেই ফর্মুলাতে ফেলে অংক করা সুবিধাজনক হয়ে উঠে। আমরা তেমনি ফর্মুলার মত প্রতীক দিতে চেষ্টা করবো যাতে তোমরা ওই প্রতীকী ঘটনা লক্ষ্য করে একই সূত্রে ফেলে সঠিক উচ্চারণ নির্দেশ করতে পারো।
প্রতীক-১) অ+ই=ও (অর্থাৎ ই-কারের প্রভাবে অ-কারটি ও-এর মতো উচ্চারিত হয়)যেমন : অই (ওই), সই (সোই), খই (খোই), দই (দোই), হৈ হৈ (হোই হোই), রৈ রৈ (রোই, রোই), কড়ি (কোড়ি), মতি (মোতি), গতি (গোতি), রতি (রোতি), পতি (পোতি), অতি (ওতি), অহি (ওহি), ছবি (ছোবি), রবি (রোবি), পলি (পোলি), অস্থি (ওস্থি), কবিতা (কোবিতা), সবিতা (সোবিতা), কলিকাতা (কোলিকাতা), অধিক (ওধিক), অগ্নি (ওগ্নি), অর্চিত (র্ওচিতো), অছিলা (ওছিলা), জরিমা (জোরিমা), তনিমা (তোনিমা), অভিনয় (ওভিনয়্), অভিজাত (ওভিজাত্) ইত্যাদি।
প্রতীক-২) অ+ঈ = ও (অর্থাৎ ঈ-কারের প্রভাবে অ-কারটি ও এর মতো উচ্চারিত হয়) যেমন : নঈ (নোই), নদী (নোদি), সতী (সোতি), গভীর (গোভির), শরীর (শোরির), অতীত (ওতিত্), অধীন্ (ওধিন্), মণীষা (মোনিশা), রসবতী (রসোবোতি), গম্ভীর (গোর্ম্ভি), অভীপ্সা (ওভিপ্সা), অহীন্দ্র (ওহিন্দ্রো), পত্নী (পোত্নি) ইত্যাদি।
প্রতীক-৩) অ+উ = ও (অর্থাৎ উ-কারের প্রভাবে অ-কারটি ও-এর মতো উচ্চারিত হয়) যেমন : বউ (বোউ), মউ (মোউ), তবু (তোবু), কভু (কোভু), তরু (তোরু), বকুল (বোকুল), কবুল (কোবুল), অধুনা (ওধুনা), অযুত (ওজুত্), মধুর (মোর্ধু), কবুতর (কোবুর্ত), অনুভব (ওনুভব্), অনুমান (ওনুমান্), অনুশীলন (ওনুশিলন্), অনুকম্পা (ওনুকম্পা), অনুকরণ (ওনুকরন্) ইত্যাদি।
প্রতীক-৪) অ+ঊ = ও (অর্থাৎ ঊ-কারের প্রভাবে অ-কারটি ও-এর মতো উচ্চারিত হয়) যেমন : বধূ (বোধু), ময়ূর (মোয়ুর), কটূক্তি (কোটুক্তি), করুন (কোরুন), মরূদ্যান (মোরুদ্দান), কর্পূর (র্কোর্পু), মসূর (মোশুর), অনূদিত (ওনুদিতো) ইত্যাদি।
প্রতীক-৫) অ+ঋ-কার = ও (অর্থাৎ ঋ-কারের প্রভাবে অ-কারটি ও-এর মতো উচ্চারিত হয়) যেমন : বক্তৃতা (বোক্তৃতা), যকৃত (জোকৃত্), কর্তৃত্ব (কোরতৃত্তো), কর্তৃপক্ষ (কোরতৃপখ্খো), কর্তৃকারক (র্কোতৃকারোক), ভতৃহরি (র্ভোতৃহরি), ভতৃহীনা (র্ভোতৃহিনা), মসৃণ (মোসৃন্) ইত্যাদি।
প্রতীক-৬) অ+ক্ষ-কার = ও (অর্থাৎ ক্ষ-এর প্রভাবে অ-কারটি ও-এর মতো উচ্চারিত হয়) যেমন : লক্ষ (লোক্খো), কক্ষ (কোক্খো) দক্ষ (দোক্খো), পক্ষ (পোক্খো), রক্ষ (রোক্খো), যক্ষ (যোক্খো), অক্ষাংশ (ওক্খাংশ), অক্ষরেখা (ওক্খোরেখা), লক্ষণ (লোক্খোন), ভক্ষণ (ভোক্খোন), তক্ষক (তোক্খোক) ইত্যাদি।
প্রতীক-৭) অ+য-ফলা = ও (অর্থাৎ য-ফলার প্রভাবে অ-কারটি ও-এর মতো উচ্চারিত হয়) যেমন : অন্য (ওন্নো), জন্য (জোন্নো), ধন্য (ধোন্নো), গণ্য (গোন্নো), পণ্য (পোননো), নব্য (নোব্বো), সভ্য (শোভ্ভো), সত্য (সোত্তো), বন্য (বোন্নো), বন্যা (বোন্না), কন্যা (কোন্না), কল্যাণ (কোল্ল্যান), গব্যঘৃত (গোব্বোঘৃতো), তথ্য (তোত্থো), পথ্য (পোত্থো), অত্যন্ত (ওত্তোনতো) অধ্যক্ষ (ওদ্ধোক্খো), অত্যাচারিত (ওত্তাচারিতো) ইত্যাদি।
প্রতীক-৮) অ+জ্ঞ = ও (অর্থাৎ জ্ঞ প্রভাবে অ-কারটি ও-এর মতো উচ্চারিত হয়)যেমন : যজ্ঞ (যোগ্গো)
দেয়াল ঘেঁষা চেয়ারের উপর রাখা ব্ল্যাকবোর্ডে সূত্রের প্রতীক লিখে মুখে মুখে রসালো ভঙ্গিতে উদাহরণ দিয়ে যাচ্ছিলেন স্যার।
দ্বিতীয় দফা চা পর্ব সারতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন স্যার। বোঝা গেল সূত্রের সরস আলোচনায় ক্ষ্যান্ত দিলেন আজ। তবে স্যারের এই ব্যাপারটি আমাদের মন কেড়েছে। সকলের সামনে নির্দ্বিধায় চা-পান পর্ব চালিয়ে যান নিরবে। স্তব্ধ ক্লাসের সকলে সে দৃশ্য উপভোগ করতে করতে ভাবি- সূত্রালোচনা না তাঁর খাওয়াপর্ব কোনটি শিল্প হয়ে উঠেছে? নাকি দুটোই।
ব্যতিক্রমও আছে (আদ্য অ)
পরের ক্লাসে কোন ভূমিকা না করে জিজ্ঞেস করলেন, অ-এর যে সূত্র দিয়েছিলাম, তা কি তোমরা আত্মস্থ করতে পেরেছো? সমস্বরে বলে উঠলাম, হ্যাঁ স্যার। আবার বললেন, শুধু ‘হ্যাঁ স্যার’ বললে চলবে না। চলনে বলনে ব্যবহার করতে হবে। যদি না লাগাও কাজে, তবে শ্রমও হবে বাজে, আর তোমরাও পড়বে লাজে। দাড়ি গোঁফের ফাঁক গলিয়ে বেরিয়ে এলো উদার হাসি। সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়তেই উদাত্ত কণ্ঠে শুরু করলেন, সেদিন সূত্রের আলোচনার সময় নিয়মের বেলায় ‘সাধারণত’ শব্দটি বলেছিলাম। কিন্তু কিছু অসাধারণ জায়গা আছে, যেখানে সূত্রমতে উচ্চারিত হয় না। এজন্য ব্যতিক্রমও জানতে হয়। নাহলে অনেক সময় বিভ্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিবে। এবার সূত্রের ব্যতিক্রম সম্বন্ধে আলোচনা করবো।
ব্যতিক্রম-ক : শব্দের প্রথমে যদি না-বোধক বা নেতিবাচক ‘অ’ কিংবা ‘অন’ কিংবা সহিতর্থে ‘স’ থাকে তাহলে কোন অবস্থাতেই সেই ‘অ’ কিংবা ‘স’ ও-কারান্ত উচ্চারিত হবে না। এখানে ‘কোন অবস্থাতেই’ বলতে বোঝানো হচ্ছে, অ, অন, কিংবা স এর পর ই-কার, উ-কার, ক্ষ, জ্ঞ যাই আসুক না কেন ‘অ’ অবিকৃত থাকবে।
যেমন : অবিকৃত (অবিকৃতো), অবিচার (অবির্চা), অস্থির (অস্থির), অবিরাম (অবিরাম্), অবিনাশী (অবিনাশি), অনিয়ম (অনিয়ম্), অনিশ্চিত (অনিশ্চিতো), অসীম (অশিম্), অতুল (অতুল্), অনুপম (অনুপম্), অনুপস্থিত (অনুপোস্থিত), অমূল্য (অমুল্লো), অদৃষ্ট (অদৃশ্টো), অতৃপ্ত (অতৃপ্তো), অন্যায় (অন্ন্যায়), অব্যয় (অব্বয়), অটুট (অটুট্), অক্ষম (অক্খম্), অক্ষয় (অক্খয়্), অজ্ঞ (অগ্গোঁ), অজ্ঞান (অগ্গ্যাঁন), সঠিক (সঠিক্), সচিত্র (সচিত্ত্রো), সবিনয় (সবিনয়্), সসীম (শশীম্), সস্ত্রীক (শস্ত্রিক্), সতীর্থ (শতিরথো)।
এই পর্যন্ত ব্লাকবোর্ডে লিখে মুখে মুখে বলে গেলেন আবার। চেয়ারে বসে ধীরে সুস্থে সামনের দিকে তাকিয়ে বললেন, এতক্ষণ যা বললাম, তা যদি তোমরা হৃদয়ঙ্গম করতে পারো, তাহলে আমি পরবর্তী ব্যতিক্রমের দিকে এগিয়ে যেতে পারি। লীনা বসেছিল চুপ করে। অনেকটা ফস্ করে বলে ফেললো, স্যার, না-বোধক ‘অ’ যদি অবিকৃত থাকে, তাহলে অতুল প্রসাদের গানকে; ওতুল প্রসাদের গান বলা হয় কেন? শব্দময় আকর্ণ বিস্তৃত হাসি ছড়িয়ে পড়লো সারা ঘরে। কিছু না বুঝে আমরাও হেসে উঠলাম জোরে। স্যার বলতে শুরু করলেন, তোমাদের যে ব্যতিক্রমটির কথা বলতে চেয়েছিলাম, ওই মেয়েটি সে কথাই পেড়ে বসলো। সে যাকগে, এবার তোমরা চলো পরবর্তী ব্যতিক্রমে।
ব্যতিক্রম-খ : যেখানে কারো নাম বোঝায় সেখানে না-বোধক ‘অ’ কোথাও কোথাও ও-কারান্ত হতে পারে। যেমন ক্লাসের ওই সুদর্শনা মেয়েটি জিজ্ঞেস করেছে ওতুল প্রসাদের গান বলা হয় কেন? এখানে অতুলের স্থলে ওতুল বলা হচ্ছে যেহেতু ওটি একটি নাম। আমাদের দেশের সঙ্গীত শিল্পী ওজিত রায় (অজিত) কিংবা কবি ওসীম (অসীম) সাহার নাম নিশ্চয়ই শুনেছো। অথবা ওবিনাশ (অবিনাশ) দত্ত কিংবা ওনুপম (অনুপম) সেন নামে কাউকে ডাকতে শুনেছো। তবে নামের ক্ষেত্রে অ-যদিও ও-এর দিকে ঝুঁকে যায়, তবু অ-কারান্ত হলে ভালো হয়, তাতে নামের দিক থেকে অর্থগত অসুবিধা হয় না।
ব্যতিক্রম-গ : ইতোপূর্বে আমরা জেনেছি ক্ষ-থাকলে, তার আগের ‘অ’ ও-কারান্ত হয়। যেমন : রোগের লক্ষণ (লোক্খোন্) কিন্তু ক্ষ তে যদি ম-ফলা থাকে, তবে আগের ‘অ’ কোথাও অ-কারান্ত উচ্চারিত হয়। যেমন রামের ভাই লক্ষ্মণ (লক্খোঁন) একইভাবে পক্ষ্ম (পক্খোঁ), যক্ষ্মা (যক্খাঁ)।
অভ্যাসবশত বক্তৃতার সময় স্যার পায়চারী করেন। বক্তৃতার মাঝে মাঝে সাময়িক বিরতিকালে বা প্রসঙ্গান্তরে যাওয়ার সময় চেয়ারে বসে একটু বিশ্রাম নেন। কিন্তু কথা সে সময় থেমে থাকে না। বসে বসেই বলতে শুরু করলেন, এতক্ষণ আমরা সূত্র এবং ব্যতিক্রম আলোচনার মাধ্যমে অ-এর প্রথম বিধি অতিক্রম করলাম মাত্র। এরপর আমরা দ্বিতীয় বিধিতে যাব। আশা করি, প্রথম বিধির তুলনায় দ্বিতীয় বিধি সহজ মনে হবে তোমাদের কাছে।
(চলবে)
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন