বৃহস্পতিবার, ১৩ অক্টোবর, ২০১১

শুদ্ধ উচ্চারণ বিষয়ক বক্তৃতা : আদ্য ‘অ’ এর অবশিষ্ট সূত্রাবলী - অধ্যাপক নরেন বিশ্বাস


পর্ব : তিন

আদ্য ‘অ’ এর অবশিষ্ট সূত্রাবলী

আদ্য অ-এর দ্বিতীয় সূত্র : শব্দের প্রথমে যদি অ-কারান্ত বর্ণে র-ফলা যুক্ত হয়, তাহলে সাধারণত ও-কারান্ত উচ্চারিত হয়। 
যেমন : প্রথম (প্রোথোম্), প্রভাত (প্রোভাত্), ব্রত (ব্রোতো), শ্রম (শ্রোম্), ভ্রমণ (ভ্রোমোন্), ভ্রমর (ভ্রোর্মো), দ্রষ্টা (দ্রোষ্টা), স্রষ্টা (স্রোষ্টা)।
ব্যতিক্রম : র-ফলা যুক্ত বর্ণটির পরে যদি ‘য়’ আসে, তাহলে কিন্তু অ-কার ঠিক থাকে। যেমন : ক্রয় (ক্রয়), ত্রয় (ত্রয়), আশ্রয় (আস্স্রয়)।
উঠে পায়চারী করতে করতে স্যার আবার শুরু করলেন কথা। এখন যে সূত্রটি আলোচিত হবে সেটি তোমাদের দৈনন্দিন জীবনের জন্য খুবই অপরিহার্য। এটি বাদ দিয়ে একটি দিনও তোমাদের চলবে না। সুতরাং এই সূত্রটির ব্যাপারে সচেতন থাকলে উচ্চারণের ক্ষেত্রে তোমরা বহু গুরুত্বপূর্ণ ত্রুটি সংশোধনের সুযোগ পাবে।

আদ্য অ-এর তৃতীয় সূত্র : সাধুভাষার পূর্ণাঙ্গ শব্দে কিংবা ক্রিয়াপদে ই-কার কিংবা উ-কার ছিল, চলিত ভাষার সংক্ষিপ্ত রূপে সেই ই-কার কিংবা উ-কার বিলুপ্ত হলেও তার আগের অ-কার প্রমিত উচ্চারণে ও-কারান্ত হয়ে থাকে। যেমন :
কলিকাতা থেকে কলকাতা (কোলকাতা)
হরিতকি থেকে হরতকি (হোরতোকি)
সজিনা থেকে সজনে (সোজনে)
ফড়িয়া থেকে ফড়ে (ফোড়ে)
বাড়িয়া থেকে বড়ে (বোড়ে)
ধরিয়া থেকে ধরে (ধোরে)
মরিয়া থেকে মরে (মোরে)
সরিয়া থেকে সরে (সোরে)
ধসিয়া থেকে ধসে (ধোসে)
পচিয়া থেকে পচে (পোচে)
গলিয়া থেকে গলে (গোলে)
পড়িয়া থেকে পড়ে (পোড়ে)
করিয়া থেকে করে (কোরে)
বসিয়া থেকে বসে (বোসে)
করিবে থেকে করবে (র্কোবে)
চলিবে থেকে চলবে (চোল্বে)
মরিবার থেকে মরবার (মোরবার)
ধরিবার থেকে ধরবার (ধোরবার)
একঘরিয়া থেকে একঘরে (এ্যাক্ঘোরে)
হলুদিয়া থেকে হলদে (হোল্দে)

এদিক ওদিক তাকিয়ে সামনে পেয়ে গেলেন জহিরকে। আঙুল তুলে প্রশ্ন করে বসলেন, আগের ক্লাসে আদ্য-অ এর তৃতীয় সূত্র আলোচনা করেছিলাম। জহির, তুমি বলোতো-সূত্রটি। জহির আম্তা আম্তা করে মাথা চুলকে বললো, চলিত ভাষার সংক্ষিপ্ত রূপে ই-কার বিলুপ্ত হলেও আগের অ-কার ও-কারান্ত হয়। দাড়ি গোঁফের ফাঁক গলিয়ে হাসি ফুটে উঠলো। চেয়ারে বসে চোখ বুজে জাবর-কাটার ভঙ্গিতে বলতে শুরু করলেন, কিন্তু সব জায়গাতে এই নিয়ম খাটবে না। এর ব্যতিক্রমও আছে। যেমন :
রইবে থেকে রোবে নয়, রবে
লইবে থেকে লোবে নয়, লবে
সইবে থেকে সোবে নয়, সবে
বইবে থেকে বোবে নয়, ববে
কইবে থেকে কোবে নয়, কবে
হইবে থেকে হোবে নয়, হবে।
কাকলি বললো, স্যার, এগুলো ছাড়া আর কোথাও ব্যতিক্রম ঘটবে না? চোখ মেলে তাকিয়ে স্থির দৃষ্টিতে বললেন, আরো কিছু থাকতেও পারে। তোমরা একটু খোঁজ করে দেখে নিও। সে যাকগে, এবারে নতুন নিয়ম বা সূত্রে প্রবেশ করছি।

আদ্য অ-এর চতুর্থ সূত্র : ১৯৩৬ সালে কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বানান সংস্কার সমিতির এক নম্বর নিয়মে বলা হলো, রেফ এর পর ব্যঞ্জনে কোন দ্বিত্ব হবে না। সুতরাং য-রেফ এর পর য-ফলা উঠে গেল। যেমন :
পর্য্যন্ত হয়ে গেল পর্যন্ত
কার্য্যালয় হয়ে গেল কার্যালয়
সূর্য্য হয়ে গেল সূর্য
বানান সংস্কার করা হলেও, উচ্চারণে কোন পরিবর্তন আনা হলো না। ফলে পূর্বের উচ্চারণটি অবিকৃত থেকেই গেল। কয়েকটি উদাহরণ দিলেই কিন্তু ব্যাপারটি তোমাদের কাছে পরিষ্কার হয়ে যাবে।
মূল বানান বর্তমান বানান উচ্চারণ
পর্য্যন্ত পর্যন্ত পোরজোনতো
পর্য্যায় পর্যায় পোরজায়
পর্য্যটন পর্যটন পোরজোটোন
পর্য্যালোচনা পর্যালোচনা পোরজালোচনা
পর্য্যবেক্ষণ পর্যবেক্ষণ পোরজোবেক্খোন 
মর্য্যাদা মর্যাদা মোরজাদা
চর্য্যাপদ চর্যাপদ চোরজাপদ

পায়চারী করতে করতে গলা চড়িয়ে দিলেন। এবারে আদ্য-অ এর পঞ্চম সূত্র সম্পর্কে বলবো। যদিও এটিকে ঠিক সূত্র বলা যাবে না, তবুও আমরা একটু নিয়মে ফেলে সমস্যার সমাধান করার চেষ্টা করবো।

আদ্য অ-এর পঞ্চম সূত্র : একাক্ষর বা এক অক্ষর বিশিষ্ট শব্দের শেষে যদি ‘ন’ থাকে, তাহলে সাধারণত পূর্বের অ-এর উচ্চারণ ও-কারান্ত হয়।
যেমন : মন (মোন), বন (বোন), জন (জোন) তবে বাংলাদেশে ধন উচ্চারণের ক্ষেত্রে ধোন্ না বলে ধন্ (অ-অবিকৃত) বলা হয় এবং জন এর ক্ষেত্রেও জোন না বলে জন্ (অ-অবিকৃত) বলা হয়ে থাকে। আবার যদি একাক্ষর শব্দের শেষে ন-এর পরিবর্তে ণ থাকে, তাহলে পূর্বের অ-টিকে অবিকৃত রেখে অ-কারান্ত উচ্চারণ করা হয়। যেমন- পণ, মণ, রণ, ক্ষণ ইত্যাদি।
একটানা পায়চারী করতে করতে কথাগুলি বলে হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়লেন স্যার। ডানগালের ভিতর পুরে রাখা ডাবল পানে জোরে জোরে কামড় দিতেই মুচমুচ শব্দের সাথে ঠোঁট রাঙা হয়ে উঠলো।
পানের রসে ভিজে থাকা গোঁফের অগ্রভাগ ডানহাতের উল্টোপিঠে মুছে নিলেন ধীরে ধীরে। চলতে চলতে আবার বলতে লাগলেন, এই একাক্ষরবিশিষ্ট শব্দগুলি যখন অন্য শব্দের সঙ্গে সন্ধির সূত্রে আবদ্ধ হয় কিংবা অন্য পদের সঙ্গে মিলিত হয়ে সমাসবদ্ধ হয়, তখন কিন্তু তার আসল উচ্চারণ অর্থাৎ অ-কারান্ত উচ্চারণের রূপেই ফিরে আসে। 
যেমন- 
মনান্তর-মনান্তর
মনোহর-মনোহর
মনোলোভা-মনোলোভা
মনোতোষিনী-মনোতোষিনি
মনোবিজ্ঞান-মনোবিগ্গাঁন
বনবাসী-বনোবাসি
বনমালী-বনোমালি
বনান্তর-বনান্তর
বনস্পতি-বনোশ্পোতি
ধনপতি-ধনোপোতি
ধনোহারী-ধনোহারি
ধনধান্য-ধনোধান্নো

আমাদের আদ্য-অ এর সূত্রের আলোচনা এখানেই শেষ হলো। তবে এই সূত্র বা নিয়মকে একমাত্র নিয়ম বা চিরাচরিত নিয়ম মনে করা উচিত নয়। কারণ মানুষের মুখের ভাষা বহমান, তা অনেক সময় পরিবর্তন হয় বলেই উচ্চারণের অনেক বিধিই পরিবর্তন হয়ে যায়। ব্যাকরণ আলোচনা, ধ্বনিতত্ত্ব আলোচনা বা ভাষাতাত্ত্বিক বিধান যতই দেয়া হোক না কেন, মানুষের মুখের ভাষার বহমানতাই হচ্ছে এর মূল নিয়ন্ত্রক।
(চলবে)

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন