প্রিয় শিক্ষার্থীবৃন্দ, বাংলাদেশের বাকশিল্পাঙ্গনে আমি তোমাদের আন্তরিকভাবে স্বাগত জানাই। তোমরা এখানে এসেছো, জানার জন্যে, কিভাবে বাংলা প্রমিত উচ্চারণে অভ্যস্ত হওয়া যায়, কিভাবে সমাধান খুঁজে পাওয়া যায়? তোমরা সারাজীবন বাংলা ভাষায় লেখাপড়া করেছো, কথা বলেছো, কিন্তু তা সত্ত্বেও ভুল উচ্চারণে তোমাদের ভাষা কণ্টকাকীর্ণ আর এজন্যে প্রথমেই জানতে হবে, আমাদের প্রমিত উচ্চারণে মূল সমস্যাটা কোথায়?
বাংলা ভাষা উচ্চারণের ক্ষেত্রে, বিশেষ করে প্রমিত উচ্চারণের ক্ষেত্রে সমস্যার জন্য আমি তোমাদের মূল পাঁচটি কারণের ব্যাখ্যা দিতে চাই। এই কারণগুলি হলো :
১) বাঙলা ভাষার লিখিতরূপের সঙ্গে বহুক্ষেত্রে তার উচ্চারিত রূপ একই হয় না।
২) বাঙলা ভাষার বর্ণ আছে একাধিক, কিন্তু তার ধ্বনি প্রতীক এক। আবার বর্ণ আছে একটি, কিন্তু তার ধ্বনি একাধিক।
৩) আমাদের উচ্চারণে প্রায়শ মহাপ্রাণ বর্ণগুলো অল্পপ্রাণ হয়ে যায়।
৪) আমাদের আঞ্চলিকতার সমস্যা।
৫) বাঙলা ভাষার প্রতি আমাদের দরদ ও আন্তরিকতার অভাব।
এজন্য আমাদের অবহেলা ও অযত্ন দায়ী।
সমস্যা নম্বর এক : আমাদের ভাষার লিখিত রূপ আর উচ্চারিত রূপ সর্বত্র এক নয়। কারণ বেশীরভাগ ক্ষেত্রে আমাদের বানান পদ্ধতি মূলতঃ সংস্কৃত ভাষা প্রভাবিত এবং উচ্চারণ পদ্ধতি প্রাকৃত প্রভাবিত। ফলে লিখিতরূপে যেখানে সংস্কৃত ব্যকরণের অনুসরণ; উচ্চারিতরূপে যদি প্রকৃত ব্যকরণের অনুসরণ হয় তবে এই দ্বৈরাজ্যিক প্রভাব, আমাদের ভাষার এই নৈরাজ্যিক অবস্থার জন্য দায়ী। রবীন্দ্রনাথ একবার ক্ষেদ করে বলেছিলেন, আমরা লিখি সংস্কৃত ভাষায়, কিন্তু সেটা পড়ি প্রাকৃত বাঙলায়। অর্থাৎ আমাদের বানান পদ্ধতি আর উচ্চারণ পদ্ধতি এক নয়। এ ব্যাপারে তোমাদের দু-একটি উদাহরণ দিয়ে বুঝিয়ে দিতে চাই। যেমন আমরা বলি আমি আত্মীয় (আত্তীঁয়) বাড়ীতে যাব, এখন এই যে আত্মীয়, এখানে ম-ফলা আছে, যদি লেখা অনুসারে পড়তে হয়, তাহলে বলতে হয় আত্মীয় বাড়ীতে যাব, না গেলে ভসমো হয়ে যায়। আসলে ভস্ম (ভস্ সো)
যেমন লেখা হচ্ছে বিশ্ব, বানান অনুসারে পড়তে গেলে বলতে হয় বিশবো। কিন্তু উচ্চারণ করা হচ্ছে বিশশো। বিদ্বান এবং উদ্যানের ক্ষেত্রে বলা হচ্ছে বিদ্দান এবং উদ্দান, কিন্তু বানান অনুযায়ী যদি উচ্চারণ করা হতো তাহলে বলতে হতো বিদ্বান এবং উদ্দ্যান। সংস্কৃত লিখিতরূপে আলাদা ছিল এবং উচ্চারণও ছিল ভিন্ন। কিন্তু বাঙলাতে ঐ বানানটি নেওয়া হলো, কিন্তু উচ্চারণটি পৃথক হয়ে গেল। ফলে আমাদের লেখায় যেমন লিখতে হয়, তেমনি বলাটাও শেখার দরকার। তাহলে আমাদের জানা দরকার, বাঙলা ভাষার লিখিত রূপ এবং উচ্চারিত রূপ কোথায় এক নয়। কেন এক নয়, কিভাবে উচ্চারণ করতে হয়। এগুলো বুঝলে আর ভুল হওয়ার সম্ভাবনা থাকবে না। এবং মূলের ভুল যদি দূর করা না যায় তাহলে কোনদিনই বিচিত্র বর্ণের ফুলও ফুটবে না।
সমস্যা নম্বর দুই : বাঙলা বর্ণমালায় আমরা বিস্ময়কর ভাবে লক্ষ্য করি, একাধিক বর্ণের ধ্বনিগত উচ্চারণ এক। যেমন দুটো ন আছে বাংলায় একটি হলো মুর্ধন্য-ণ আর একটি দন্ত্য-ন। কিন্তু এই দুটো ন কে আমরা ভিন্নরকম উচ্চারণ করি না। উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে জনগণ। এখানে জনতে দন্ত্য ন থাকলেও গণ এ আছে মূর্ধন্য ণ। কিন্তু উচ্চারণের সময় দুটো ন এর কোন পার্থক্য থাকছে না। আবার জ আছে দুটো। একটি বর্গীয় জ এবং আর একটি হলো অস্তস্থ য। কিন্তু জামাই এবং যম শব্দ দুটোতে দুরকম য থাকলেও উচ্চারণে কোন ভিন্নতা পাওয়া যায় না। মুখে জমে থাকা পানের রস চুক্ করে গিলে ফেলে একটু যেন অপ্রস্তুত হলেন স্যার। সামনের সারিতে বসা মুনিরা, লাবনী, খোকনদের তন্ময় ভাব লক্ষ্য করে নিজের জগতে ফিরে গেলেন যেন। গুরুগম্ভীর অথচ শ্রুতিমধুর ধ্বনিময়তা আবার আচ্ছন্ন করে ফেললো উন্মুখ হৃদয়গুলোকে। দেখো তোমরা, একটি নয়, দুটি নয়, তিনটি স। একটাকে বলে তালব্য, একটাকে বলে মূর্ধন্য আর একটাকে বলে দন্ত্য। এই যে তিনটি শ, এই তিনটি স-ই কিন্তু বাঙলা ভাষাতে আমাদের উচ্চারণে এক হয়ে যায়। কারণ আমরা শেষে কিন্তু বলি তালব্য-স, মূর্ধন্য-স, দন্ত্য-স অর্থাৎ স, ষ এবং শ। তিনটি স-এর চেহারা আলাদা উচ্চারণ এক। একটি উদাহরণ দিলে তোমাদের কাছে ব্যাপারটি পরিষ্কার হয়ে যাবে। “সবিশেষ” লিখতে তিনটি স-ই ব্যবহৃত হচ্ছে। কিন্তু উচ্চারণে তিনটি স-এর কোন ভিন্নতা খুঁজে পাওয়া যায় না। পায়চারী শেষ করে চেয়ারে বসতে বসতে বলে চললেনÑ বর্ণ আছে একটি, কিন্তু তাকে ঘিরে ধ্বনি একাধিক। স্বরবর্ণের প্রথম বর্ণ-অ। এটা কোথাও ‘অ’ এর মতো উচ্চারিত হয়। আবার কোথাও ‘ও’ এর মতো উচ্চারিত হয়। যেমন অত (অ অবিকৃত) ভাবার দরকার নেই, অতি (অ-ও এর মতো) বাড় বেড়ো না। আমি কব (অ-অবিকৃত) না কথা, আমি কবি (অ ও এর মতো) না। আবার নটবর এবং নই শব্দ দুটোতে দেখা যাচ্ছে নটবর এর অ ঠিক অ-এর মত উচ্চারিত হয়, কিন্তু নই এর অ ও এর মতো উচ্চারিত হয়। অর্থাৎ একই অ কখনো অ-এর মতো, আবার কখনো ও এর মতো আচরণ করছে। আমরা বলি একটি একটি করে উদাহরণ দেব। আর যখন বলবো, না, একটি নয়, একটা একটা করে উদাহরণ দেব। এই যে একটি এবং একটা। যখন টি বলছি তখন এ অবিকৃত থেকে এ এর মতো আচরণ করছে। কিন্তু যখন টা বলছি তখন এ ভোল পাল্টে অ্যা এর মতো আচরণ করছে। তাহলে আমরা একই বর্ণের একাধিক উচ্চারণ লক্ষ্য করতে পারছি কিনা বল তোমরা।
আবার বললেন, তোমাদের মতি যদি ঠিক থাকে, তবে গতিও ঠিক থাকবে, আর তাতে তোমাদের ক্ষতির সম্ভাবনা থাকবে না বললেই চলে।
সমস্যা নম্বর তিন : তোমরা হয়তো জানো, প্রাণ মানে বাতাস। যে বর্ণ উচ্চারণ করতে বাতাস কম লাগে তাকে বলা হয় অল্পপ্রাণ, আর বাতাস বেশী লাগলে তাকে বলি মহাপ্রাণ। বাঙলা বর্ণমালায় যে পাঁচটি বর্গ আছে, ওই প্রতিটি বর্গের দ্বিতীয় এবং চতুর্থ বর্গগুলি হচ্ছে মহাপ্রাণ। খ-ছ-ঠ-থ-ফ-ঘ-ঝ-ঢ-ধ-ভ এই দশটি বর্ণকে যদি আমরা আলাদা করে ফেলি এবং তাদের যথাযথ অনুশীলন করি, তবে প্রাণগত সমস্যার উত্তরণ ঘটবে বলে আমার বিশ্বাস। কিন্তু আমাদের দেশে প্রায়শ আমরা উচ্চারণে মহাপ্রাণ ধ্বনিকে অবহেলা, অযত্ন করি। ফলে ধ্বনি বিনষ্ট বা ম্রিয়মান হয়ে অল্পপ্রাণের মতো আচরণ করে। কখনো কখনো বিলুপ্তও করে ফেলি মহাপ্রাণ ধ্বনিকে। তোমাদের আমি দু’একটি ঘটনার কথা বলি তাতে তোমরা বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পাবে। বাংলাদেশ টেলিভিশনে একদিন আমার রেকর্ডিং এ স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে বেশী সময় ব্যয় হওয়ায় এক ছাত্রকে বললাম যে তুমি ফেরার পথে আমার বাসা হয়ে যেও। তোমার বৌদিকে জানিয়ে দিও, আমার ফিরতে দেরী হবে। তারা যেন আমার জন্য চিন্তা না করে। সে বললো কি জানো? বললো, স্যার আপনার বাসায় গিয়ে বৌদিকে কবর দিয়ে দেব। আমি বললাম, আমার একটি মাত্র বউ, আর তাকে তুমি জ্যান্ত কবর দিয়ে দিবে? সে কিন্তু বেশ লজ্জা পেল। আর একদিন, রোকেয়া হলের সামনে দিয়ে আমি হেঁটে বাসার দিকে যাচ্ছিলাম। পরিচিত কয়েকজন ছাত্রছাত্রীর সঙ্গে দেখা হতেই জিজ্ঞেস করলাম তোমরা কি করছ? চট্ করে একজন বললো, স্যার, আমরা আমরা খাচ্ছি। আমি বললাম, ঠিক আছে, তোমরা তোমাদের খেতে থাক। আমার বরং এখান থেকে চলে যাওয়াই শ্রেয়। এরকমভাবে প্রায়শই আমাদের উচ্চারণ বিভ্রাটের ফলে ভাত হয়ে যায় বাত, খাল হয়ে যায় কাল, ঝাল হয়ে যায় জাল, কথা হয়ে যায় কতা। অন্ধ হলে কি প্রলয় বন্ধ থাকে এর স্থলে যদি বলা হয় অন্দ হলে কি প্রলয় বন্দ থাকে তাহলে অবস্থা কোন পর্যায়ে যায় তোমরা নিশ্চয় বুঝতে পারছো? ডাক্তার যদি নাড়ী ধরার পরিবর্তে নিত্যনূতন নারী ধরা শুরু করেন, তাহলে ডাক্তারী পেশা না, তার জীবন নিয়ে টানাটানি পড়ে যাবে না?
সমস্যা নম্বর চার : বাংলাদেশ বিভিন্ন অঞ্চলে বিভক্ত। এবং সকল অঞ্চল মিলিতভাবে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। একেক অঞ্চলের মানুষের মুখের ভাষার টান, স্বর প্রক্ষেপণ, বাকরীতি, বাক্যের সুর এবং স্বর ভিন্ন প্রকৃতির হওয়ায় অপর অঞ্চলের মানুষের মুখের ভাষার সঙ্গে স্পষ্ট পার্থক্য ধরা পড়ে। এটিকে বলে আঞ্চলিক ভাষা বা উপভাষা। নোয়াখালী অঞ্চলের লোক যখন ময়মনসিংহ অঞ্চলের লোকের সঙ্গে কথা বলে অথবা রংপুরের লোক যখন চট্টগ্রামের কারো সাথে কথা বলে তখন আমরা চারটি আঞ্চলিক ভাষার কথা শুনতে পাই। কিন্তু পত্র লেখার সময় সাধ্যমত আঞ্চলিক ভাষা পরিহার করে প্রমিত বাঙলায় লেখার চেষ্টা করে এরা সকলেই। তাহলে বুঝতেই পারছো লিখিত রূপটির বেলায় আমরা সচেতন থাকলেও মুখের ভাষার ব্যাপারটিতে আঞ্চলিকতা পরিহার করার কোন গরজ আমাদের নেই। অর্থাৎ লেখার ভাষা এক হলেও বলার ভাষা আলাদা।
আমি তোমাদের আঞ্চলিক ভাষাকে অবহেলা বা উপেক্ষা করতে বলছি না। যখন তুমি মায়ের কাছে বা গাঁয়ে যাবে বা আঞ্চলিক কোন চরিত্রে অভিনয় করবে তখন আঞ্চলিক ভাষাতে কথা বললে কোন আপত্তি নাই। কিন্তু যখন সবার জন্য বলবে বা সভাতে বলবে তখন আঞ্চলিক ভাষা পরিহার করবে। তবে একটি কথা তুমি যদি সারাক্ষণ পা টেনে হাঁটতে থাকো, তবে তোমার হাঁটার ঐ বৈশিষ্ট্য ত্যাগ করে হঠাৎ তোমার হাঁটাহাটি সুন্দর করতে পারবে না। সুন্দর হাঁটার জন্য তোমাকে সব সময়ই সুন্দরভাবে পা ফেলার অনুশীলন করে যেতে হবে। ঠিক সেরকমই, প্রমিত ভাষার উচ্চারণ দক্ষতা অর্জনের জন্য বা উত্তরণের জন্য তোমাকে আঞ্চলিক ভাষার বেশ কিছু বৈশিষ্ট্য ত্যাগ করতে হবে। আঞ্চলিক ভাষাকে বর্জন করে প্রমিত ভাষার উচ্চারণে অভ্যস্ত হয়ে উঠার জন্য এর কোন বিকল্প নেই।
সমস্যা নম্বর পাঁচ : এটি হলো আমাদের জাতীয় সমস্যা তোমাদের সুন্দর পোষাক পরিচ্ছদ ও মুখের সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য যে সময় ব্যয় করে থাকো, মুখের ভাষার সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য সেই সময়টুকু ব্যয় করো কিনা, তা তোমরা হলফ করে বলতে পারবে? একজন বিশিষ্ট ব্যক্তি বক্তৃতা দেয়ার সময় অবলীলায় বলেছেন সনমানিত সবাপতি। কিন্তু তিনি কি ইংরেজি বক্তৃতা দেবার সময় বলবেন হনারেবল ফ্রেসিডেন্ট। কখনোই তিনি এমন ভুল করবেন না। কারণ তিনি ইংরেজি শেখেন। রপ্ত করেন, কিন্তু বাঙলা তাঁর মাতৃভাষা হলেও এটি শেখার জন্য কোন গরজ অনুভব করেন না।
তিনটি জিনিসের ঋণ জীবনে শোধ দেওয়া যায় না। তিনটি ম। একটি হল মা, একটি হলো মাটি এবং একটি হলো মাতৃভাষা। মা আমাদের জন্ম দেয়, মাটি আমাদের লালন করে আর মাতৃভাষা আমাদের প্রকাশ করে। আসলে আত্মপ্রকাশের জন্য মাতৃভাষার কোন বিকল্প নেই। ভাষা ভাল বললে, ব্যক্তিত্বের প্রকাশ ঘটবে। কিন্তু সেটাতো এমনি এমনি ঘটবে না। তার জন্য বারংবার অনুশীলন করতে হবে। কিছু পেতে হলে তোমাকে কিছু দিতে হবে। প্রেম কখনো একতরফা হয় না। তুমি ভাষার বিনিময়ে তোমার অস্তিত্বকে বিজ্ঞাপিত করবে সুন্দরভাবে এবং তুমিও সাধনার মধ্য দিয়েই সার্থক হবে।
(চলবে)
বাংলা ভাষা উচ্চারণের ক্ষেত্রে, বিশেষ করে প্রমিত উচ্চারণের ক্ষেত্রে সমস্যার জন্য আমি তোমাদের মূল পাঁচটি কারণের ব্যাখ্যা দিতে চাই। এই কারণগুলি হলো :
১) বাঙলা ভাষার লিখিতরূপের সঙ্গে বহুক্ষেত্রে তার উচ্চারিত রূপ একই হয় না।
২) বাঙলা ভাষার বর্ণ আছে একাধিক, কিন্তু তার ধ্বনি প্রতীক এক। আবার বর্ণ আছে একটি, কিন্তু তার ধ্বনি একাধিক।
৩) আমাদের উচ্চারণে প্রায়শ মহাপ্রাণ বর্ণগুলো অল্পপ্রাণ হয়ে যায়।
৪) আমাদের আঞ্চলিকতার সমস্যা।
৫) বাঙলা ভাষার প্রতি আমাদের দরদ ও আন্তরিকতার অভাব।
এজন্য আমাদের অবহেলা ও অযত্ন দায়ী।
সমস্যা নম্বর এক : আমাদের ভাষার লিখিত রূপ আর উচ্চারিত রূপ সর্বত্র এক নয়। কারণ বেশীরভাগ ক্ষেত্রে আমাদের বানান পদ্ধতি মূলতঃ সংস্কৃত ভাষা প্রভাবিত এবং উচ্চারণ পদ্ধতি প্রাকৃত প্রভাবিত। ফলে লিখিতরূপে যেখানে সংস্কৃত ব্যকরণের অনুসরণ; উচ্চারিতরূপে যদি প্রকৃত ব্যকরণের অনুসরণ হয় তবে এই দ্বৈরাজ্যিক প্রভাব, আমাদের ভাষার এই নৈরাজ্যিক অবস্থার জন্য দায়ী। রবীন্দ্রনাথ একবার ক্ষেদ করে বলেছিলেন, আমরা লিখি সংস্কৃত ভাষায়, কিন্তু সেটা পড়ি প্রাকৃত বাঙলায়। অর্থাৎ আমাদের বানান পদ্ধতি আর উচ্চারণ পদ্ধতি এক নয়। এ ব্যাপারে তোমাদের দু-একটি উদাহরণ দিয়ে বুঝিয়ে দিতে চাই। যেমন আমরা বলি আমি আত্মীয় (আত্তীঁয়) বাড়ীতে যাব, এখন এই যে আত্মীয়, এখানে ম-ফলা আছে, যদি লেখা অনুসারে পড়তে হয়, তাহলে বলতে হয় আত্মীয় বাড়ীতে যাব, না গেলে ভসমো হয়ে যায়। আসলে ভস্ম (ভস্ সো)
যেমন লেখা হচ্ছে বিশ্ব, বানান অনুসারে পড়তে গেলে বলতে হয় বিশবো। কিন্তু উচ্চারণ করা হচ্ছে বিশশো। বিদ্বান এবং উদ্যানের ক্ষেত্রে বলা হচ্ছে বিদ্দান এবং উদ্দান, কিন্তু বানান অনুযায়ী যদি উচ্চারণ করা হতো তাহলে বলতে হতো বিদ্বান এবং উদ্দ্যান। সংস্কৃত লিখিতরূপে আলাদা ছিল এবং উচ্চারণও ছিল ভিন্ন। কিন্তু বাঙলাতে ঐ বানানটি নেওয়া হলো, কিন্তু উচ্চারণটি পৃথক হয়ে গেল। ফলে আমাদের লেখায় যেমন লিখতে হয়, তেমনি বলাটাও শেখার দরকার। তাহলে আমাদের জানা দরকার, বাঙলা ভাষার লিখিত রূপ এবং উচ্চারিত রূপ কোথায় এক নয়। কেন এক নয়, কিভাবে উচ্চারণ করতে হয়। এগুলো বুঝলে আর ভুল হওয়ার সম্ভাবনা থাকবে না। এবং মূলের ভুল যদি দূর করা না যায় তাহলে কোনদিনই বিচিত্র বর্ণের ফুলও ফুটবে না।
সমস্যা নম্বর দুই : বাঙলা বর্ণমালায় আমরা বিস্ময়কর ভাবে লক্ষ্য করি, একাধিক বর্ণের ধ্বনিগত উচ্চারণ এক। যেমন দুটো ন আছে বাংলায় একটি হলো মুর্ধন্য-ণ আর একটি দন্ত্য-ন। কিন্তু এই দুটো ন কে আমরা ভিন্নরকম উচ্চারণ করি না। উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে জনগণ। এখানে জনতে দন্ত্য ন থাকলেও গণ এ আছে মূর্ধন্য ণ। কিন্তু উচ্চারণের সময় দুটো ন এর কোন পার্থক্য থাকছে না। আবার জ আছে দুটো। একটি বর্গীয় জ এবং আর একটি হলো অস্তস্থ য। কিন্তু জামাই এবং যম শব্দ দুটোতে দুরকম য থাকলেও উচ্চারণে কোন ভিন্নতা পাওয়া যায় না। মুখে জমে থাকা পানের রস চুক্ করে গিলে ফেলে একটু যেন অপ্রস্তুত হলেন স্যার। সামনের সারিতে বসা মুনিরা, লাবনী, খোকনদের তন্ময় ভাব লক্ষ্য করে নিজের জগতে ফিরে গেলেন যেন। গুরুগম্ভীর অথচ শ্রুতিমধুর ধ্বনিময়তা আবার আচ্ছন্ন করে ফেললো উন্মুখ হৃদয়গুলোকে। দেখো তোমরা, একটি নয়, দুটি নয়, তিনটি স। একটাকে বলে তালব্য, একটাকে বলে মূর্ধন্য আর একটাকে বলে দন্ত্য। এই যে তিনটি শ, এই তিনটি স-ই কিন্তু বাঙলা ভাষাতে আমাদের উচ্চারণে এক হয়ে যায়। কারণ আমরা শেষে কিন্তু বলি তালব্য-স, মূর্ধন্য-স, দন্ত্য-স অর্থাৎ স, ষ এবং শ। তিনটি স-এর চেহারা আলাদা উচ্চারণ এক। একটি উদাহরণ দিলে তোমাদের কাছে ব্যাপারটি পরিষ্কার হয়ে যাবে। “সবিশেষ” লিখতে তিনটি স-ই ব্যবহৃত হচ্ছে। কিন্তু উচ্চারণে তিনটি স-এর কোন ভিন্নতা খুঁজে পাওয়া যায় না। পায়চারী শেষ করে চেয়ারে বসতে বসতে বলে চললেনÑ বর্ণ আছে একটি, কিন্তু তাকে ঘিরে ধ্বনি একাধিক। স্বরবর্ণের প্রথম বর্ণ-অ। এটা কোথাও ‘অ’ এর মতো উচ্চারিত হয়। আবার কোথাও ‘ও’ এর মতো উচ্চারিত হয়। যেমন অত (অ অবিকৃত) ভাবার দরকার নেই, অতি (অ-ও এর মতো) বাড় বেড়ো না। আমি কব (অ-অবিকৃত) না কথা, আমি কবি (অ ও এর মতো) না। আবার নটবর এবং নই শব্দ দুটোতে দেখা যাচ্ছে নটবর এর অ ঠিক অ-এর মত উচ্চারিত হয়, কিন্তু নই এর অ ও এর মতো উচ্চারিত হয়। অর্থাৎ একই অ কখনো অ-এর মতো, আবার কখনো ও এর মতো আচরণ করছে। আমরা বলি একটি একটি করে উদাহরণ দেব। আর যখন বলবো, না, একটি নয়, একটা একটা করে উদাহরণ দেব। এই যে একটি এবং একটা। যখন টি বলছি তখন এ অবিকৃত থেকে এ এর মতো আচরণ করছে। কিন্তু যখন টা বলছি তখন এ ভোল পাল্টে অ্যা এর মতো আচরণ করছে। তাহলে আমরা একই বর্ণের একাধিক উচ্চারণ লক্ষ্য করতে পারছি কিনা বল তোমরা।
আবার বললেন, তোমাদের মতি যদি ঠিক থাকে, তবে গতিও ঠিক থাকবে, আর তাতে তোমাদের ক্ষতির সম্ভাবনা থাকবে না বললেই চলে।
সমস্যা নম্বর তিন : তোমরা হয়তো জানো, প্রাণ মানে বাতাস। যে বর্ণ উচ্চারণ করতে বাতাস কম লাগে তাকে বলা হয় অল্পপ্রাণ, আর বাতাস বেশী লাগলে তাকে বলি মহাপ্রাণ। বাঙলা বর্ণমালায় যে পাঁচটি বর্গ আছে, ওই প্রতিটি বর্গের দ্বিতীয় এবং চতুর্থ বর্গগুলি হচ্ছে মহাপ্রাণ। খ-ছ-ঠ-থ-ফ-ঘ-ঝ-ঢ-ধ-ভ এই দশটি বর্ণকে যদি আমরা আলাদা করে ফেলি এবং তাদের যথাযথ অনুশীলন করি, তবে প্রাণগত সমস্যার উত্তরণ ঘটবে বলে আমার বিশ্বাস। কিন্তু আমাদের দেশে প্রায়শ আমরা উচ্চারণে মহাপ্রাণ ধ্বনিকে অবহেলা, অযত্ন করি। ফলে ধ্বনি বিনষ্ট বা ম্রিয়মান হয়ে অল্পপ্রাণের মতো আচরণ করে। কখনো কখনো বিলুপ্তও করে ফেলি মহাপ্রাণ ধ্বনিকে। তোমাদের আমি দু’একটি ঘটনার কথা বলি তাতে তোমরা বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পাবে। বাংলাদেশ টেলিভিশনে একদিন আমার রেকর্ডিং এ স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে বেশী সময় ব্যয় হওয়ায় এক ছাত্রকে বললাম যে তুমি ফেরার পথে আমার বাসা হয়ে যেও। তোমার বৌদিকে জানিয়ে দিও, আমার ফিরতে দেরী হবে। তারা যেন আমার জন্য চিন্তা না করে। সে বললো কি জানো? বললো, স্যার আপনার বাসায় গিয়ে বৌদিকে কবর দিয়ে দেব। আমি বললাম, আমার একটি মাত্র বউ, আর তাকে তুমি জ্যান্ত কবর দিয়ে দিবে? সে কিন্তু বেশ লজ্জা পেল। আর একদিন, রোকেয়া হলের সামনে দিয়ে আমি হেঁটে বাসার দিকে যাচ্ছিলাম। পরিচিত কয়েকজন ছাত্রছাত্রীর সঙ্গে দেখা হতেই জিজ্ঞেস করলাম তোমরা কি করছ? চট্ করে একজন বললো, স্যার, আমরা আমরা খাচ্ছি। আমি বললাম, ঠিক আছে, তোমরা তোমাদের খেতে থাক। আমার বরং এখান থেকে চলে যাওয়াই শ্রেয়। এরকমভাবে প্রায়শই আমাদের উচ্চারণ বিভ্রাটের ফলে ভাত হয়ে যায় বাত, খাল হয়ে যায় কাল, ঝাল হয়ে যায় জাল, কথা হয়ে যায় কতা। অন্ধ হলে কি প্রলয় বন্ধ থাকে এর স্থলে যদি বলা হয় অন্দ হলে কি প্রলয় বন্দ থাকে তাহলে অবস্থা কোন পর্যায়ে যায় তোমরা নিশ্চয় বুঝতে পারছো? ডাক্তার যদি নাড়ী ধরার পরিবর্তে নিত্যনূতন নারী ধরা শুরু করেন, তাহলে ডাক্তারী পেশা না, তার জীবন নিয়ে টানাটানি পড়ে যাবে না?
সমস্যা নম্বর চার : বাংলাদেশ বিভিন্ন অঞ্চলে বিভক্ত। এবং সকল অঞ্চল মিলিতভাবে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। একেক অঞ্চলের মানুষের মুখের ভাষার টান, স্বর প্রক্ষেপণ, বাকরীতি, বাক্যের সুর এবং স্বর ভিন্ন প্রকৃতির হওয়ায় অপর অঞ্চলের মানুষের মুখের ভাষার সঙ্গে স্পষ্ট পার্থক্য ধরা পড়ে। এটিকে বলে আঞ্চলিক ভাষা বা উপভাষা। নোয়াখালী অঞ্চলের লোক যখন ময়মনসিংহ অঞ্চলের লোকের সঙ্গে কথা বলে অথবা রংপুরের লোক যখন চট্টগ্রামের কারো সাথে কথা বলে তখন আমরা চারটি আঞ্চলিক ভাষার কথা শুনতে পাই। কিন্তু পত্র লেখার সময় সাধ্যমত আঞ্চলিক ভাষা পরিহার করে প্রমিত বাঙলায় লেখার চেষ্টা করে এরা সকলেই। তাহলে বুঝতেই পারছো লিখিত রূপটির বেলায় আমরা সচেতন থাকলেও মুখের ভাষার ব্যাপারটিতে আঞ্চলিকতা পরিহার করার কোন গরজ আমাদের নেই। অর্থাৎ লেখার ভাষা এক হলেও বলার ভাষা আলাদা।
আমি তোমাদের আঞ্চলিক ভাষাকে অবহেলা বা উপেক্ষা করতে বলছি না। যখন তুমি মায়ের কাছে বা গাঁয়ে যাবে বা আঞ্চলিক কোন চরিত্রে অভিনয় করবে তখন আঞ্চলিক ভাষাতে কথা বললে কোন আপত্তি নাই। কিন্তু যখন সবার জন্য বলবে বা সভাতে বলবে তখন আঞ্চলিক ভাষা পরিহার করবে। তবে একটি কথা তুমি যদি সারাক্ষণ পা টেনে হাঁটতে থাকো, তবে তোমার হাঁটার ঐ বৈশিষ্ট্য ত্যাগ করে হঠাৎ তোমার হাঁটাহাটি সুন্দর করতে পারবে না। সুন্দর হাঁটার জন্য তোমাকে সব সময়ই সুন্দরভাবে পা ফেলার অনুশীলন করে যেতে হবে। ঠিক সেরকমই, প্রমিত ভাষার উচ্চারণ দক্ষতা অর্জনের জন্য বা উত্তরণের জন্য তোমাকে আঞ্চলিক ভাষার বেশ কিছু বৈশিষ্ট্য ত্যাগ করতে হবে। আঞ্চলিক ভাষাকে বর্জন করে প্রমিত ভাষার উচ্চারণে অভ্যস্ত হয়ে উঠার জন্য এর কোন বিকল্প নেই।
সমস্যা নম্বর পাঁচ : এটি হলো আমাদের জাতীয় সমস্যা তোমাদের সুন্দর পোষাক পরিচ্ছদ ও মুখের সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য যে সময় ব্যয় করে থাকো, মুখের ভাষার সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য সেই সময়টুকু ব্যয় করো কিনা, তা তোমরা হলফ করে বলতে পারবে? একজন বিশিষ্ট ব্যক্তি বক্তৃতা দেয়ার সময় অবলীলায় বলেছেন সনমানিত সবাপতি। কিন্তু তিনি কি ইংরেজি বক্তৃতা দেবার সময় বলবেন হনারেবল ফ্রেসিডেন্ট। কখনোই তিনি এমন ভুল করবেন না। কারণ তিনি ইংরেজি শেখেন। রপ্ত করেন, কিন্তু বাঙলা তাঁর মাতৃভাষা হলেও এটি শেখার জন্য কোন গরজ অনুভব করেন না।
তিনটি জিনিসের ঋণ জীবনে শোধ দেওয়া যায় না। তিনটি ম। একটি হল মা, একটি হলো মাটি এবং একটি হলো মাতৃভাষা। মা আমাদের জন্ম দেয়, মাটি আমাদের লালন করে আর মাতৃভাষা আমাদের প্রকাশ করে। আসলে আত্মপ্রকাশের জন্য মাতৃভাষার কোন বিকল্প নেই। ভাষা ভাল বললে, ব্যক্তিত্বের প্রকাশ ঘটবে। কিন্তু সেটাতো এমনি এমনি ঘটবে না। তার জন্য বারংবার অনুশীলন করতে হবে। কিছু পেতে হলে তোমাকে কিছু দিতে হবে। প্রেম কখনো একতরফা হয় না। তুমি ভাষার বিনিময়ে তোমার অস্তিত্বকে বিজ্ঞাপিত করবে সুন্দরভাবে এবং তুমিও সাধনার মধ্য দিয়েই সার্থক হবে।
(চলবে)
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন