শনিবার, ২৬ নভেম্বর, ২০১১

শুদ্ধ উচ্চারণ বিষয়ক বক্তৃতা : অন্ত্য ‘অ’ এর সূত্র - অধ্যাপক নরেন বিশ্বাস



পর্ব : পাঁচ

শুরু হলো অন্ত্য-অ

গত সপ্তাহে হঠাৎ করে অচেতন হয়ে যাওয়ায় স্যারকে বারডেম হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়েছিল। উচ্চারণের ক্লাসটি আর হবে কি না তা নিয়ে সন্দেহ ছিল বেশ। কিন্তু এক সপ্তাহেই ফিরে আসবেন তা ভাবতে পারে নি কেউ। অন্য দিনের মতো চটপটে ভাব না থাকলেও গলার জোর কমে নি স্যারের। ‘চলা’ ধীর হলেও ‘গলা’ এবং ‘বলা’র দাপট আছে আগের মতোই। চেয়ারে বসে থেকেই হাঁক দিলেন, আদ্য-অ এবং মধ্য-অ এর পর এবার আমরা অন্ত্য-অ-এর সূত্র আলোচনা করবো। লেখ তোমরা :
প্রথম সূত্র : শব্দের শেষে যদি অ-কারান্ত যুক্ত ব্যঞ্জনবর্ণ থাকে তা হলে তার প্রথমটি হসন্ত এবং দ্বিতীয়টি সাধারণত: ও-কারান্ত উচ্চারিত হয়।যেমন-
যুক্ত - যুক্ + তো - যুক্তো
শক্ত - শক্ + তো - শক্তো
ভক্ত - ভক্ + তো - ভক্তো
রক্ত - রক্ + তো - রক্তো
যত্র - যত + ত্রো - যত্ত্রো
তত্র - তত্ + ত্রো - তত্ত্রো
পত্র - পত্ + ত্রো - পত্ত্রো
মাত্র - মাত্ + ত্রো - মাত্ত্রো
গঞ্জ - গন্ + জো - গন্জো
কক্স - কক্ + সো - কক্সো
ভণ্ড - ভন্ + ডো - ভন্ডো
অভ্যাসবশত একটু উঠে দাঁড়ালেন। আগের মতো শরীরে জোর না থাকায় পায়চারী করার চেষ্টা করেও হাঁটতে পারলেন না। চেষ্টা আর না বাড়িয়ে বলতে শুরু করলেন দ্বিতীয় সূত্র।
দ্বিতীয় সূত্র : ত কিংবা ইত প্রত্যয়যোগে গঠিত শব্দে অন্তিম-অ রক্ষিত এবং ও-কারান্ত উচ্চারিত হয়ে থাকে। যেমন :
নত - নতো
গত - গতো
মত - মতো
যত - যতো
তত - ততো
শতশত - শতোশতো
গঠিত - গোঠিতো
রক্ষিত - রোক্খিতো
পালিত - পালিতো
দিক্ষিত - দিক্খিতো
মোহিত - মোহিতো
লোলিত - লোলিতো
নিশ্চিত - নিশ্চিতো
নির্মিত - নির্মিতো
মৌসুমীর মাঝে মাঝে ফোড়ন কাটার অভ্যাস আছে। ফট্ করে বলে ফেললো স্যার, আমরা তাহলে এখন থেকে ভাত্কে ভাতো, হাত্কে হাতো বলবো? দুম্ করে বোমা ফাটার মতো হাসিতে ফেটে পড়লো ক্লাসশুদ্ধ সবাই। কোনরকম অপ্রস্তুত না হয়ে স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে বলে চললেন স্যার, যে সকল শব্দ বিশেষ্য রূপে ব্যবহৃত হয়, সে সকল শব্দে সাধারণত হসন্ত উচ্চারিত হয়। তাছাড়া মানুষের মুখের ভাষার ব্যবহারে কতকগুলো শব্দের উচ্চারণ বদল হয়ে যায়। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায় :
হাত - হাত্
ভাত - ভাত্
অতীত - ওতিত্
উচিত - উচিত্
মৌসুমী এখনো হাল ছাড়ে নি। আগের মতো উদ্ধত ভঙ্গিতে বলে উঠলো, স্যার আপনি বললেন মোহিত উচ্চারণ মোহিতো হবে। কিন্তু আমরা তো কবি মোহিত লাল মজুমদারকে কখনো মোহিতো লাল মজুমদার বলি না। এবার আর কেউ হাসলো না। প্রশ্নটা খুবই সিরিয়াস ভেবেই বোধহয় চুপ করে থাকলো সকলে। কেউ না হাসলেও স্যারের মুখভর্তি হাসি ছড়িয়ে পড়লো। মৌসুমীর দিকে তর্জনী উঁচু করে বোঝাতে শুরু করলেন, তোমার জিজ্ঞাসাকে কটাক্ষ না করে সহজ ভাষায় প্রশমিত করার চেষ্টা করা দরকার। আমি আগে কোথাও কোথাও যেমনটি বলেছি, বিশেষ্য বা নামের ক্ষেত্রে এখানেও ব্যতিক্রম লক্ষ্য করা যায়। এ ক্ষেত্রে নাম বা পদবী হলে সাধারণত অন্তিম-অ টি হসন্ত উচ্চারিত হয়। যেমন :
রনজিত রক্ষিত - রোক্খিত্
মাধুরী দিক্ষিত - দিক্খিত্
আনন্দচন্দ্র পালিত - পালিত্
লোলিত মোহন নাথ - লোলিত্
মোহিত লাল মজুমদার - মোহিত্
শম্পা খুব সহজ সরল। ওর প্রশ্ন করার ধরণটাও বেশ সাধারণ। স্যার একটু থামতেই উঠে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করলো, আমরা নিশ্চিত্ বলবো না নিশ্চিতো বলবো? শম্পার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে স্যার বলতে লাগলেন, সূত্রমতে আমরা এখনো পর্যন্ত নিশ্চিত কে নিশ্চিতোই বলবো। কিন্তু এখন অনেকেই নিশ্চিত্ বলছেন দ্বিধাহীন চিত্তে। হয়তো এমন একদিন আসবে, যখন মুখের ভাষার গতিময়তো নিশ্চিতো কে নিশ্চিত্, স্থগিতো কে স্থগিত্ করে ফেলবে। তখন আমাদের মেনে নেওয়া ছাড়া আর কোনো গত্যন্তর থাকবে না।
এতক্ষণে লিকার চায়ের প্রতি স্যারের তৃষ্ণা তুঙ্গে উঠেছে। কিন্তু রইস এখনো চা নিয়ে ঢুকছে না দেখে বেশ জোরে হাঁক দিলেন। দরজার বাইরে থেকে রইসের লাজনম্র মুখখানা ভিতরে চলে এলো। হাতের ইশারায় স্যারকে আশ্বস্ত করে দ্রুত বেরিয়ে গেল আবার। যেন কিছুই ঘটেনি এমনভাবে বলতে লাগলেন ফের।
তৃতীয় সূত্র : বাঙলা ভাষাতে এমন কিছু শব্দ রয়েছে যেগুলি বিশেষ্যরূপে ব্যবহৃত হওয়ার সময় হসন্ত উচ্চারিত হয়, কিন্তু বিশেষণ রূপে ব্যবহৃত হওয়ার সময় ও-কারান্ত উচ্চারিত হয়।
বিশেষ্য
ভাল (কপাল) - ভাল্
কাল (সময়) - কাল্
বিশেষণ
ভাল (উত্তম) - ভালো
কাল (রঙ) - কালো
চতুর্থ সূত্র : বিশেষ্যবাচক শব্দের শেষে ‘হ’ এবং বিশেষণবাচক শব্দের শেষে ‘ঢ়’ থাকলে সাধারণত ও-কারান্ত উচ্চারিত হয়। যেমন :
বিবাহ - বিবাহো গাঢ় (গাঢ়ো)
কলহ - কলোহো দৃঢ় (দৃঢ়ো)
বিরহ -বিরহো মূঢ় (মুঢ়ো)
গ্রহ - গ্রোহো প্রগাঢ় (প্রোগাঢ়ো)
স্নেহ - স্নেহো দেহ - দেহো
মৌসুমী মনে হয় এখনো শান্ত হতে পারে নি। আবারো সুযোগ পেয়ে ফস্ করে বলে ফেললো, স্যার তাহলে আষাঢ়কে আষাঢ়ো বলতে হবে? এবারে স্যার বেশ বিরক্ত হলেন। গলা দিয়ে গাঁক করে শব্দ বেরিয়ে এলো। বিব্রত মৌসুমীকে আরো চটানোর জন্য দীপু পেছন থেকে সহানুভূতির ছলে চুক্ চুক্ শব্দ করতেই ধপাস করে বসে পড়লো মৌসুমী। ধীরলয়ে স্যার বলতে লাগলেন, বিশেষণ বাচক শব্দের শেষে ‘ঢ়’ থাকলে ও-কারান্ত উচ্চারণ করতে হয়। কিন্তু আষাঢ় বিশেষণবাচক নয়, বিশেষ্যবাচক শব্দ। তাই এক্ষেত্রে আষাঢ়কে আষাঢ় বলা হয়। একগ্লাস লাল চা, বাটিতে ছোলামুড়ি ও দুটো সবরি কলা নিয়ে রইস পাশের চেয়ারে রাখলো। ক্লান্ত যতীন স্যার বসে পড়লেন চেয়ারে। রইসের দিকে সস্নেহ দৃষ্টি মেলে মৃদু ধন্যবাদ দিলেন যেন।

অন্ত্য-অ-এর শেষ সূত্র

ভিতরে ঢুকেই হাঁক দিলেন, জহির, তুমি বলোতো, অন্ত্য-অ-এর সূত্র শেষ হয়েছে কি না? প্রশ্নের ধরণ বুঝতে না পেরে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে দাঁড়িয়ে থাকলো জহির। শম্পা খুবই সপ্রতিভ। জহিরকে রক্ষা করার জন্য চট্ করে বলে ফেললো, স্যার, অন্ত্য-অ-এর চারটি সূত্র বলা হয়েছিল। আমার মনে হয়, আরো কয়েকটি সূত্র বাকী রয়েছে। শম্পার কথায় স্যার বেশ খুশী হলেন মনে হলো । ওর কথা লুফে নিয়ে বললেন, হ্যাঁ, এবারে অন্ত্য-অ-এর পরবর্তী সূত্র।
পঞ্চম সূত্র : বাঙলা ভাষার যে সকল শব্দের বানানে বিসর্গ ছিল, কিন্তু বর্তমান বানানে বিসর্গ বিলুপ্ত হয়েছে, সেসকল শব্দের উচ্চারণ সাধারণত ও-কারান্ত হয়। যেমন :-
প্রথমত - প্রোথমত (প্রোথোমতো)
বস্তুত - বস্তুত (বোস্তুতো)
দ্বিতীয়ত - দ্বিতীয়ত (দিতিয়তো)
সতত -সতত (সততো)
প্রণত - প্রণত (প্রনতো)
প্রায়শ - প্রায়শ (প্রায়শো)
পায়চারী বন্ধ করে চেয়ারে বসে পড়লেন। মিনিট খানেক পরে ক্লাসরুমের স্তব্ধতা ভেদ করে গমগমে স্বরে বলে উঠলেন পুনরায়, পাঁচ নম্বর সূত্রের পর ছয় নম্বর সূত্রে প্রবেশ করতে যাচ্ছি আমরা। এর মধ্যে তোমাদের মনে কোনো প্রশ্ন জেগে থাকলে বলতে পারো। মিনিট দুয়েক অপেক্ষা করে কোনো উত্তর পেলেন না স্যার। হাসিমুখে উঠে দাঁড়ালেন আবার। হাঁটতে হাঁটতে শুরু করলেন পরবর্তী সূত্র।
ষষ্ঠ সূত্র : বাঙলা ভাষায় ‘তর’ এবং ‘তম’ প্রত্যয়যোগে গঠিত শব্দে শেষের ‘অ’ সাধারণত রক্ষিত থাকে এবং ও-কার উচ্চারিত হয়। যেমন :
উচ্চতর - উচ্চোতরো
উচ্চতম - উচ্চোতমো
অধিকতর - অধিকোতরো
গভীরতর - গভিরোতরো
বৃহত্তম - বৃহত্তমো
ক্ষুদ্রতর - ক্ষুদ্দ্রতরো
ক্ষুদ্রতম - ক্ষুদ্দ্রতমো
শম্পা আবার উঠে দাঁড়ালো। দু-হাত বুকের কাছে উঠিয়ে খুব আস্থার সাথে উচ্চারণ করলো, স্যার, তাহলে আমরা এখন থেকে উত্তমকে উত্তমো বলবো। যতীন স্যার কিন্তু মোটেই রাগ করলেন না। সবার হাসির হুল্লোড়ের মাঝে গলা চড়িয়ে বললেন, শম্পার কথায় হাসির কিছু নাই।
ও, সরলভাবে সূত্র অনুসরণ করে কথাটি বলে ফেলেছে। তাতে ওর কোনো দোষ দেখি না। মূল ব্যাপারটি হচ্ছে, এটি একটি ব্যতিক্রম। উত্তম-এর উচ্চারণ হবে উত্তম্। সে যাকগে, এবারে আমরা সপ্তম ও শেষ সূত্রে প্রবেশ করবো।
সপ্তম সূত্র : ঙ, ং, ঋ-কার, ঐ-কার, ঔ-কার এর পরে অ-কারান্ত বর্ণ থাকলে সাধারণত শেষের বর্ণটি ও-কারান্ত উচ্চারিত হয়। যেমন-
ঙ : 
অঙ্ক - অঙ্কো
বঙ্ক - বঙ্কো
শঙ্খ - শঙ্খো
ং : 
অংশ - অংশো
বংশ - বংশো
ধ্বংশ - ধ্বংশো
কংশ - কংশো
ঋ-কার : 
কৃশ - কৃশো
বৃষ - বৃশো
তৃণ - তৃনো
নৃপ - নৃপো
মৃগ - মৃগো
ঐ-কার : 
দৈব - দোইবো
শৈব - শোইবো
স্ত্রৈণ - স্ত্রোইনো
জৈন - জোইনো
কৈল - কোইলো
হৈল - হোইলো
তৈল - তোইলো
ঔ-কার :
গৌণ - গোও্নো
মৌন - মোও্নো
ধৌত - ধোও্তো
ভৌত - ভোও্তো
ভৌম - ভোও্মো
পৌর - পোওরো
সৌর - সোওরো
গৌর - গোওরো
একটানা এতগুলো নিয়ম বলতে বলতে স্যার হাঁফিয়ে উঠেছিলেন। স্যারেরতো শুধু বলা নয়। বলার সঙ্গে চলাও বাদ যায় না। বলা চলা আর গলা এই তিন নিয়েইতো স্যারের আসল কলা। চেয়ারে বসে পড়লেন ধপ্ করে। চা ঠাণ্ডা হয়ে গিয়েছিল। আধঘন্টা আগে দিয়ে যাওয়া চা গরম থাকে কি করে? ঠাণ্ডা চায়ে মুখ দিয়ে একটু বিকৃত হলো স্যারের মুখ। তারপর সামলে নিয়ে পরম তৃপ্তিভরে লম্বা চুমুক দিয়ে গ্লাসের অর্ধেক চা শেষ করে ফেললেন।
শম্পার যেন আজ কি হয়েছে। বারবার উঠে দাঁড়ানোর প্রবণতা আবার তাকে পেয়ে বসলো। স্যারের নিরবতার সুযোগে উঠে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করলো, স্যার, এক্ষেত্রে কোন ব্যতিক্রম নেই? সাথে সাথে কোন উত্তর না দিয়ে হাফপ্লেটে পড়ে থাকা ডাবল্ পান মুখে পুরে কুচমুচ শব্দ তুলে সামনে তাকালেন। হা করে হাতের তালু থেকে বাবাজর্দার দলা মুখের ভিতর ছুঁড়ে দিলেন। চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকা শম্পাকে হাতের ইশারায় বসতে বলে উঠে দাঁড়ালেন। হাঁটতে হাঁটতে বললেন, ব্যতিক্রমতো অবশ্যই আছে। যেমন :
খৈল - খইল্
দৌড় - দোউড়্
পৌষ - পোউষ্
গৌড় - গোউড়্
হঠাৎ পেছন ফিরে চেয়ারের পাশে পড়ে থাকা কাপড়ের ঝোলাটা কাঁধে তুলে নিলেন। ঝট্ করে ঘুরেই চলতে লাগলেন দরজার দিকে। কেউ কিছু বললো কি না সে ব্যাপারে ভাবার কোন প্রয়োজন বোধ করলেন না স্যার।
(চলবে)

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন